ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের মোহ, কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ভারত

অনলাইন ডেস্ক

ভারত ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরির উচ্চাকাঙ্ক্ষী উদ্যোগে নাম লেখানোর যে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে, তা সামরিক কৌশলগত দৃষ্টিতে যৌক্তিক মনে হলেও বাস্তবে নানা জটিলতা ও অনিশ্চয়তায় ঘেরা। একটি আধুনিক ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান কেবল একটি সাধারণ যুদ্ধবিমান নয় বরং এটি স্বয়ংক্রিয় বা আংশিক স্বয়ংক্রিয় ড্রোন বা ‘লোয়াল উইংম্যান’, উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বমানের স্টিলথ প্রযুক্তি, সেন্সর এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ব্যবস্থার সমন্বয়ে একটি উড়ন্ত কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার হিসেবে কাজ করে। বিশ্বের শীর্ষ সামরিক শক্তিগুলোর এই দৌড়ে ভারতের আগ্রহ স্বাভাবিক হলেও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির বর্তমান আকাশ প্রতিরক্ষার বাজেট, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং শিল্প কাঠামোর সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করলে এই পরিকল্পনা একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

বর্তমানে ভারতের প্রতিরক্ষা খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো একই সঙ্গে বহুসংখ্যক ভিন্ন ভিন্ন মেগা প্রকল্পে মনোযোগ দেওয়া। ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্স বা ভারতীয় বিমানবাহিনী বর্তমানে নিজস্ব প্রযুক্তির তেজস মার্ক-টু, নিজস্ব পঞ্চম প্রজন্মের অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফট বা আমকা প্রকল্প এবং ১১৪টি যুদ্ধবিমান কেনার জন্য বহুল আলোচিত মাল্টি-রোল ফাইটার এয়ারক্রাফট (এমআরএফএ) প্রকল্পের কাজ একযোগে চালিয়ে যাচ্ছে। এর ওপর যদি ইউরোপীয় কোনো দেশের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের প্রকল্পে নতুন করে যুক্ত হতে হয়, তবে প্রতিটি প্রকল্পে প্রয়োজনীয় সময়, অর্থ এবং প্রযুক্তিগত বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন থেকেই যায়।

চীনের জে-টুয়েন্টি কিংবা তুরস্কের কানের মতো পঞ্চম প্রজন্মের ফাইটার জেটের উন্নয়ন ব্যয় যেখানে ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়, সেখানে আমকা প্রকল্পের গবেষণা ও উন্নয়নের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে মাত্র ১.৮ বিলিয়ন ডলার। এই বাজেট যে ভবিষ্যতে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে, তা সহজেই অনুমেয়। তার ওপর সর্বাধুনিক ষষ্ঠ প্রজন্মের বিমানে বিপুল বিনিয়োগ করতে গেলে দেশের অন্যান্য প্রতিরক্ষা কেনাকাটা ও প্রযুক্তি উন্নয়নের বাজেট সংকটে পড়ার বড় আশঙ্কা তৈরি হয়।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও ভারতের জন্য পথটি খুব একটা মসৃণ নয়। যুক্তরাজ্য, ইতালি এবং জাপানের গ্লোবাল কমব্যাট এয়ার প্রোগ্রাম (জিস্যাপ) ইতোমধ্যে বহু বিলিয়ন পাউন্ডের বিনিয়োগে কাজ শুরু করে দিয়েছে। ভারত এখন এই জোটভুক্ত হতে চাইলে কতটুকু প্রযুক্তিগত সুবিধা পাবে, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের ওপর কতটা স্বত্বাধিকার থাকবে বা তাদের বিমান খাতের শিল্পগুলো কেবল যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী না হয়ে মূল অংশীদার হতে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। অন্যদিকে ফ্রান্স, জার্মানি এবং স্পেনের যৌথ ফিউচার কমব্যাট এয়ার সিস্টেম বা এফসিএএস প্রকল্প থেকে কাজের দায়িত্ব ও প্রযুক্তির ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে প্রধান অংশীদাররা সরে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপীয় শক্তিগুলোর এই ব্যর্থতা ভারতের জন্য একটি বড় সতর্কতা বার্তা যে, যৌথ উদ্যোগ মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযুক্তি হস্তান্তর নয়।

সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিমানের ইঞ্জিন তৈরির জটিলতা। ষষ্ঠ প্রজন্মের মতো উচ্চমানের ফাইটার জেট তৈরি করার পূর্বশর্ত হলো শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য ইঞ্জিন তৈরি করা, যা করতে হলে উন্নত মেটালার্জি, থার্মাল ম্যানেজমেন্ট ও নির্ভুল ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের বহু বছরের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। ভারত এখনও আমকা প্রকল্পের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের জিই এফফোরওয়ানফোর ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরশীল এবং পরবর্তীতে ইঞ্জিন তৈরির জন্য ফরাসি কোম্পানি সাফরান বা ব্রিটিশ রোলস-রয়েসের সঙ্গে যৌথ সমঝোতার চেষ্টা করছে। নিজস্ব ইঞ্জিন প্রযুক্তিতে পুরোপুরি স্বাবলম্বী হওয়ার আগেই ষষ্ঠ প্রজন্মের সার্বভৌম ফাইটার জেটের দাবি বাস্তবে রূপ দেওয়া বেশ কঠিন।

সূত্র: এনডিটিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights