হুতি ও ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা, উত্তপ্ত পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল

অনলাইন ডেস্ক

সম্প্রতি সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরাকে অবস্থানরত ইরান-সমর্থিত বেশ কয়েকটি মিলিশিয়া বাহিনীর একাধিক সদস্য নিহত হয়েছেন। এর আগে সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোতে চালানো ড্রোন হামলার পেছনে এসব ইরাকি গোষ্ঠীকে দায়ী করে ওয়াশিংটন ও রিয়াদ, যদিও সেই হামলার দায় স্বীকার করেছিল ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা দ্য অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) হাতে আসা তথ্য অনুযায়ী, আঞ্চলিক শীর্ষ কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে যৌথভাবে এই দ্বিমুখী হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ইরাকি মিলিশিয়াদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেছিল হুতি।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে ইসরায়েলের সীমান্তে নিজ প্রভাব বিস্তারে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী তৈরি করে আসছিল। তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা থেকে হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধে এ গোষ্ঠীগুলো মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে। ইসরায়েলি বাহিনীর তীব্র হামলায় ফিলিস্তিনের হামাসের পাশাপাশি ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্র হিসেবে পরিচিত লেবাননের হিজবুল্লাহও চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক কর্মকর্তা ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান এখন ইরাকি মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুতিদের ব্যবহার করে সৌদি আরব ও পারস্য উপসাগরে অবস্থিত আমেরিকার অন্যান্য মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার পথ বেছে নিয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকা ও ইসরায়েল যে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল, তার কৌশলগত খরচ বাড়িয়ে দেওয়াই এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য।

তবে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এক যুদ্ধকৌশল হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সম্প্রতি মঙ্গলবার সৌদি আরবের তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে হুতির একের পর এক হামলায় রাজ্যটির সাথে পুরোদমে যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, চলতি মাসের শেষ নাগাদ ইরাক সরকার তাদের ভূখণ্ডে সক্রিয় সমস্ত মিলিশিয়াকে অস্ত্র সংবরণের নির্দেশ দিলেও ইরান-সমর্থিত শক্তিশালী দলগুলো তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। একই সাথে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার জন্য আমেরিকার নতুন প্রচেষ্টা অঞ্চলটিতে সংঘাতকে আরও উসকে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

ইরাকে চালানো ওই ড্রোন হামলায় হুতিদের সরাসরি অংশ নেওয়ার বিষয়টি গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে নিশ্চিত করেছেন দুই সৌদি কর্মকর্তা এবং ইরাকের এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা। তারা জানান, ইরাকি মিলিশিয়াদের পরিচালনাধীন মূল অপারেশন রুমে হুতি প্রতিনিধিদের স্পষ্ট উপস্থিতি ছিল। জবাবে সৌদি আরব ও মার্কিন বাহিনীর যৌথ বিমান হামলায় কমপক্ষে ২০ জন ইরাকি যোদ্ধা, ৬ জন ইরানি উপদেষ্টা এবং অন্তত ১ জন হুতি কর্মকর্তা নিহত হন। ইতিপূর্বে অপ্রকাশিত এই হুতি কর্মকর্তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এক হুতি প্রতিনিধি এবং ইরাকি মিলিশিয়া বাহিনীর একজন সদস্য। মার্কিন এক সামরিক কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, ইরাকে এর আগেও বিভিন্ন হামলায় হুতি নিহত হয়েছে। ইরাকে হুতির সক্রিয় উপস্থিতি এবং সেখান থেকে সৌদি আরবসহ অন্য দেশে হামলা চালানোর সক্ষমতা নিয়ে আমেরিকা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

যদিও ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীর অংশ হিসেবে পরিচিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের (পিএমএফ) দুই কর্মকর্তা সৌদি আরবে ড্রোন হামলায় নিজেদের যুক্ত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, হুতি তাদের নিয়ন্ত্রণে বা ছায়াতলে কাজ করছে না। অবশ্য পিএমএফ-এর অধীনে বেশ কিছু শক্তিশালী ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠী রয়েছে, যারা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে প্রায়শই স্বাধীনভাবে সামরিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। সংবেদনশীল বিষয় হওয়ায় এসব তথ্যের সত্যতা দেওয়া সব কর্মকর্তা ও মিলিশিয়া সদস্যরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন। এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে হুতির সাথে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

গাজা যুদ্ধের সময় থেকেই মূলত ইরাকি মিলিশিয়া এবং তুলনামূলক সুসংগঠিত হুতির মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ওই সময় তারা ইসরায়েলে ধারাবাহিক হামলা পরিচালনায় একে অপরকে সহায়তা করেছিল। হুতি প্রধান আবদেল-মালেক আল-হুথি সে সময় প্রকাশ্যে একটি যৌথ সামরিক অপারেশন রুমের অস্তিত্বের কথা উল্লেখ করেছিলেন। পরবর্তীতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানে হামলা চালালে সংঘাতের পরিধি বাড়াতে এবং পারস্য উপসাগরের তেল উৎপাদনকারী মার্কিন মিত্র দেশগুলোকে কোণঠাসা করতে ইরান ও তার মিত্ররা উপসাগরীয় দেশগুলোতে আক্রমণ জোরদার করে। জুন মাসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বার্তায় ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকারের উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মদি লিখেছিলেন, চলমান যুদ্ধে ইরান একটি সমন্বিত ও বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করেছে, যেখানে কেবল একটি একক ফ্রন্ট বা নির্দিষ্ট হাতিয়ারের ওপর নির্ভর করে যুদ্ধ পরিচালনা করা হচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ইয়েমেন বিশ্লেষক আহমেদ নাগি এ বিষয়ে পর্যালোচনা করে বলেন, গাজা যুদ্ধের সময় হুতির ব্যাপক উত্থান ইরাকে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এর ফলে সেখানকার বহু গোষ্ঠী হুতির সমর্থন দিতে আগ্রহী হয় এবং বিনিময়ে হুতিও নিজেদের অর্জিত সামরিক অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি ইরাকি মিলিশিয়াদের সাথে শেয়ার করা শুরু করে। নাগির মতে, গোষ্ঠীগুলো যৌথভাবে এখন সৌদি আরবকে দুই দিক থেকে প্রচণ্ড চাপে ফেলছে।

ইরাকে হামলার মাত্র এক সপ্তাহ আগে লোহিত সাগরে সৌদি সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর অবরোধ ঘোষণা করে হুতি। এর ফলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, তার পাশাপাশি লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথটিও সরাসরি হুমকির মুখে পড়ে। যুদ্ধ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘অ্যাকলেড’-এর তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসের শেষভাগ থেকে হুতি লোহিত সাগরে সৌদি তেল স্থাপনা ও ট্যাংকার লক্ষ্য করে ডজনেরও বেশি হামলা চালিয়েছে। দক্ষিণ সৌদি আরবের বিভিন্ন তেল স্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামো লক্ষ্য করে হুতির চালানো হামলায় নারী ও শিশুসহ ৭০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। হুতির প্রতিনিয়ত আক্রমণ ও অবরোধ এড়াতে সৌদি আরব লোহিত সাগরে তাদের তেলবাহী জাহাজের ট্র্যাকিং সিগন্যাল বন্ধ করে যাতায়াত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটা সামুদ্রিক বাণিজ্যে বেশ বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে অবরুদ্ধ করার পর সৌদি আরব বাধ্য হয়ে তাদের অধিকাংশ তেল সরবরাহ লোহিত সাগর কেন্দ্রিক করে ফেলে। কিন্তু হুতি সেখানে আক্রমণ শুরু করলে রিয়াদ তাদের তেল উত্তরের সুয়েজ খাল এবং মিসরের সুমেদ পাইপলাইনে পাঠানো শুরু করে। বৈশ্বিক শিপিং পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের হিসাব মতে, সুমেদ পাইপলাইন দিয়ে তেল সরবরাহের পরিমাণ গত জুনে প্রতিদিন ৬ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল থাকলেও আগস্টে তা বেড়ে ১৯ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। তবে গত মাসে হুতি প্রমাণ করে যে তারা ওই সুদূর উত্তরের রুটটিতেও আঘাত হানতে সক্ষম। হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার দূরে লোহিত সাগরের উত্তরাঞ্চলে সুয়েজ খালগামী একটি সৌদি তেল ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি।

ওয়াশিংটনের নিউ আমেরিকা থিঙ্ক ট্যাংকের ইয়েমেন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম ব্যারন এ বিষয়ে বলেন, দীর্ঘমেয়াদে লোহিত সাগর উপকূলে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের কৌশলগত সুবিধার জন্য হুতি স্বল্পমেয়াদি যেকোনো ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করতে পুরোপুরি প্রস্তুত। তার মতে, পুরোদমে সংঘাত ফিরে আসার সেই সময় ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে এবং এটি থামানোর জন্য কেউ এগিয়ে আসবে কি না তা এখনো অনিশ্চিত, বিশেষ করে যখন মার্কিন দৃষ্টি কেবল ইরানের দিকে নিবদ্ধ এবং সৌদি আরবও ইয়েমেন যুদ্ধে নতুন করে সরাসরি জড়াতে দ্বিধাগ্রস্ত।

২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে হুতি। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন জানিয়ে সংঘাতের ময়দানে নামে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। সৌদির মূল ভয় ছিল ইয়েমেনে তাদের একদম সীমানা ঘেষে লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো শক্তিশালী ও বিপজ্জনক কোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠীর স্থায়ী ভিত তৈরি হতে দেওয়া যাবে না। জাতিসংঘের হিসেবে ইয়েমেনের এ দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে ইতোমধ্যে অন্তত দেড় লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং দেশটিকে বারবার দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ২০২২ সাল থেকে চলে আসা যুদ্ধবিরতি চুক্তি এখন পুরোপুরি চূর্ণ-বিচূর্ণ। বছরের পর বছর ধরে চলা সৌদি অবরোধ হুতির ওপর মানসিক ও সামরিক চাপ সৃষ্টি করলেও বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গার্টন কলেজের ইয়েমেন বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ কেন্ডাল মনে করেন, অবরোধের মুখে হুথিরা সবসময় শত্রুতা বাড়িয়ে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করে। এই নতুন করে শুরু হওয়া যুদ্ধ হুতির সুযোগ করে দিতে পারে পূর্ব ইয়েমেনের তেল-সমৃদ্ধ ভূখণ্ডগুলোর ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার। আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা এবং সৌদি জোটের অবরোধ পাশ কাটিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে হুতির উন্নত ও আধুনিক অস্ত্র ইয়েমেনে চোরাচালান করে আনছে। ইরান তাদের অস্ত্র দেওয়ার কথা অস্বীকার করলেও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে উদ্ধার হওয়া এবং বিভিন্ন সময়ে জব্দ করা অস্ত্র চালানে ইরানি প্রযুক্তির স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। বর্তমানে হুতির অস্ত্রাগারে রয়েছে বিভিন্ন ধরণের ক্রুজ ও ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, আধুনিক ড্রোন এবং চালকহীন সাবমেরিন।

বর্তমানে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরের বন্দরনগরী হোদাইদা এবং পশ্চিম উপকূলীয় তায়েজ প্রদেশসহ বেশ কয়েকটি যুদ্ধক্ষেত্রে সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী হুতিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। অন্যদিকে, সরকারি বাহিনীর দখলে থাকা লোহিত সাগরের মূল বন্দর মোখাতে হামলা জোরদার করেছে হুতি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৌদি আরব সরাসরি আবার হুতিদের সাথে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে জড়াতে অনিচ্ছুক হলেও হুতি যদি এভাবে তাদের আক্রমণ ও উসকানি অব্যাহত রাখে, তবে রিয়াদ বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত ও সিদ্ধান্তমূলক সামরিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে।

সূত্র: এপি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights