বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ে শঙ্কার বার্তা দিল গবেষণা

অনলাইন ডেস্ক

জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে বিশ্বের স্বাভাবিক তাপমাত্রা যে হারে বাড়ছে, তা এখন পৃথিবীর বনভূমি, জলাভূমি এবং মেরু অঞ্চলের হিমায়িত মাটিকে এমনভাবে বদলে দিচ্ছে যে, এগুলো নিজেই এখন ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমন শুরু করেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক চাঞ্চল্যকর গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃতির এই স্বয়ংক্রিয় উসকে দেওয়ার প্রক্রিয়ার (ফিডব্যাক লুপ) কারণে শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মাত্রা অতিরিক্ত ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।

আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ লেটার্স-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় সতর্ক করে বলা হয়েছে, মানবসৃষ্ট দূষণের ফলে সৃষ্ট তাপমাত্রা বৃদ্ধি এখন প্রাকৃতিক উৎসগুলো থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের পথ উন্মুক্ত করে দিচ্ছে। উচ্চ অক্ষাংশের স্থায়ীভাবে জমে থাকা বরফ বা পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়া, শুষ্ক বনাঞ্চলে ঘন ঘন ভয়াবহ দাবানল এবং জলাভূমি ও লেকগুলোর পানি গরম হয়ে ওঠার ফলে সেখানে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ মিথেন ও কার্বন ডাই অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে জলবায়ু সংকট আরও তীব্র রূপ ধারণ করছে।

বিজ্ঞানী ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের জলবায়ু প্রতিক্রিয়া বলয় সম্পর্কে অবগত থাকলেও বৈশ্বিক নীতি ও জলবায়ু প্রক্ষেপণগুলোতে প্রাকৃতিক উৎসের এই নির্গমনকে অনেকাংশেই হিসাবের বাইরে রাখা হতো। নতুন গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক নির্গমনের ফলে বর্তমান শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রায় অতিরিক্ত ০.২ ডিগ্রি থেকে ০.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত যোগ হতে পারে। প্রথম দর্শনে এটি সামান্য মনে হলেও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তাপমাত্রার সামান্য তারতম্যও বিশ্বজুড়ে মারাত্মক তাপদাহ, বন্যা ও খরার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

গত সপ্তাহেই জাতিসংঘ স্বীকার করেছে যে প্রাক-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ধরে রাখার যে আন্তর্জাতিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল, তা আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই অতিক্রম হয়ে যাবে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাত আরও দ্রুত ও তীব্র হবে। তবে নতুন এই গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বাস্তব পরিস্থিতি বর্তমান অনুমানের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে, কারণ বর্তমান নীতি নির্ধারণী মডেলগুলোতে পারমাফ্রস্ট, জলাভূমি, মিষ্টি পানি ও দাবানল থেকে নির্গত মিথেন ও কার্বন ডাই অক্সাইডের প্রভাবকে সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

গবেষণার প্রধান দলনেতা ও স্পার্ক ক্লাইমেট সলিউশনস রিসার্চের বিজ্ঞানী স্যাম এবারনেথি জানান, নীতি নির্ধারণী কাঠামোর মূল মডেলগুলোতে এই গোপন অনুঘটকের প্রভাব অনুপস্থিত। এর অর্থ হলো, আমরা ভবিষ্যতে কী পরিমাণ উষ্ণায়নের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি তাকে খাটো করে দেখা হচ্ছে এবং সেই অনুযায়ী ক্ষতিকর কার্বন নির্গমনের অবশিষ্ট সীমা ভুলভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ও এই গবেষণার সহ-লেখক রব জ্যাকসন জানিয়েছেন, কার্বন চক্রের এই বিপর্যয় আমরা এখন সরাসরি নিজেদের চোখে দেখতে পাচ্ছি। একে নীতি নির্ধারকদের জন্য জরুরি সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরবর্তী প্রজন্মের জলবায়ু সংক্রান্ত নীতিমালায় এগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। নতুবা পৃথিবীর জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সব পথ একেবারেই বন্ধ হয়ে যাবে।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের ভয়, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে যদি গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলে যায়, পারমাফ্রস্টের বিলুপ্তি ঘটে কিংবা আমাজন রেইনফরেস্ট মরুভূমিতে পরিণত হয়, তবে পৃথিবী এমন এক বিপর্যয়কর সীমা অতিক্রম করবে, যেখান থেকে মানবজাতির আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। অরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটির পরিবেশবিদ বিল রিপল এই নতুন গবেষণা সম্পর্কে মন্তব্য করে বলেন, প্রাকৃতিক এই স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়াগুলো মানুষের তৈরি উষ্ণায়নকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত এবং ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights