ঢেউয়ের সঙ্গে বৈঠার ছন্দ, কুড়িগ্রামে ধরলাপাড়ে নৌকা বাইচের ফাইনাল
নুরনবী মিয়া, কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে ধরলা নদীর বুকে আবারও ফিরে এলো গ্রামবাংলার চিরচেনা সেই উচ্ছ্বাস। বৈঠার ছন্দে ছন্দে কেঁপে উঠল নদীর বুক, আর দুই তীরজুড়ে মানুষের কণ্ঠে উঠল উৎসাহের ঢেউ। শুক্রবার বিকালে ফুলবাড়ীর শিমুলবাড়ী ধরলা সেতুপাড়ে ১৫ দিনব্যাপী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছে। নদীর দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে ফাইনাল খেলাটি রূপ নেয় গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, আনন্দ ও সম্প্রীতির এক মহামিলনে।
দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নৌকা বাইচ দেখতে ধরলাপাড়ে ভিড় করেন। নদীর বুকে যখন সারিবদ্ধভাবে বাইছালদের বৈঠা পড়ছিল, তখন তীরে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো দর্শক নানা ধরনের গ্রামবাংলার স্লোগান ও উৎসাহব্যঞ্জক ধ্বনিতে খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করেন। কোথাও হাততালি, কোথাও উল্লাস, আবার কোথাও প্রিয় দলের জন্য সমর্থকদের সমবেত চিৎকার—সব মিলিয়ে ধরলা নদীর শান্ত জলরাশি যেন এক বিকেলের জন্য পরিণত হয়েছিল উৎসবের মঞ্চে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আধুনিক বিনোদনের ভিড়ে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে। এমন আয়োজন শুধু বিনোদন নয়, নতুন প্রজন্মের সামনে বাংলার লোকঐতিহ্য তুলে ধরারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। একই সঙ্গে এ ধরনের আয়োজন মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে।
ফাইনাল খেলায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুড়িগ্রাম-২ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য ড. আতিকুর রহমান মুজাহিদ।
ফুলবাড়ী ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আমিনুল রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভা সঞ্চালনা করেন উপজেলা এনপিপির সিনিয়র সদস্যসচিব রাজু সরকার। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন উপজেলা এনপিপির আহ্বায়ক নাজমুল ফেরদৌস লাভলু, এনসিপি নেতা আব্দুল লতিফ মিয়া, আরিফুর রহমান আরিফ, রাকিবুল হাসান মানিক, মো. আরিফ মিয়া ও নুর আমিন মিয়াসহ অন্যান্যরা।
তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফাইনালে প্রথম স্থান অর্জন করে তামিম বাংলা বাইচাল দল। দ্বিতীয় স্থান লাভ করে আশার আলো বাইচাল দল। বিজয়ী দলকে পুরস্কার হিসেবে একটি মহিষ এবং রানারআপ দলকে একটি গরু প্রদান করা হয়।
সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ার আগ পর্যন্ত ধরলাপাড়ে ছিল মানুষের ঢল। ফাইনালের বাঁশি বাজার পরও দর্শকদের উচ্ছ্বাস যেন থামছিল না। বৈঠার ঝাপটা আর মানুষের করতালিতে শুক্রবারের সেই বিকেল যেন আবারও মনে করিয়ে দিল গ্রামবাংলার লোকঐতিহ্য এখনও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে, শুধু তাকে ধরে রাখার জন্য প্রয়োজন এমন প্রাণের আয়োজন।
