অথই সংকটে হাবুডুবু

রুবেল হোসাইন, জাবি

সেবার অবকাঠামোদেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) সংকটের অকূল পাথারে হাবুডুবু খাচ্ছে। বিরাজ করছে শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষের সংকট। চলছে দীর্ঘ সেশনজট। শিক্ষাছুটিতে গিয়ে শিক্ষকরা ফিরছেন না। সাবেক শিক্ষার্থীরা দখল করে রেখেছেন আবাসিক হলের সিট। ভোগান্তির শিকার নতুন শিক্ষার্থীরা। দুর্বল চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রশাসনিক কাজে অটোমেশন না থাকায়ও ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া নতুন বিভাগ ও আবাসিক হল চালু হলেও প্রয়োজনীয় শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ ও সেবার অবকাঠামো বাড়েনি। শ্রেণিকক্ষসংকটে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষককে অনেক সময় গাছতলায় পাঠদান করাতে হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে সীমাহীন ভোগান্তি পোহাচ্ছেন প্রায় ১৩ হাজার শিক্ষার্থী।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যানুযায়ী, ১৯৭০ সালের ২০ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ৩৮টি বিভাগ ও চারটি ইনস্টিটিউটে প্রায় ১৩ হাজার নিয়মিত শিক্ষার্থী রয়েছেন। তাদের জন্য আবাসিক হল ২১টি। প্রতিষ্ঠার ৫৬ বছরেও সংকটে জর্জরিত বিশ্ববিদ্যালয়টি। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, ১৮টি বিভাগ ও তিনটি ইনস্টিটিউটে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকট রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:২০ ধরা হলেও জাবির অনেক বিভাগে তা ১:৫০ ছাড়িয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ হলেও জাবিতে আইন ও বিচার বিভাগ ছাড়া আর কোনো বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। শিক্ষক সংকটে থাকা বিভাগগুলোর মধ্যে রয়েছে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ, মার্কেটিং, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, সরকার ও রাজনীতি, নৃবিজ্ঞান, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা, অর্থনীতি, ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান, পরিসংখ্যান ও উপাত্তবিজ্ঞান, গণিত, প্রত্নতত্ত্ব, চারুকলা, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, আইন ও বিচার, ফার্মেসি, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ, পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স এবং তিনটি ইনস্টিটিউট। শিক্ষক সংকটে ফার্মেসি, তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউট, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব ও চারুকলাসহ কয়েকটি বিভাগে এক থেকে দুই বছরের বেশি সেশনজট তৈরি হয়েছে। শিক্ষক সংকট সামাল দিতে অতিথি শিক্ষক দিয়ে দায়সারাভাবে চলছে পাঠদান।

ফার্মেসি বিভাগের ৪৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী নীরব বলেন, শিক্ষক সংকটে সিলেবাস শেষ করতে দেরি হয়। ল্যাব ও পরীক্ষার আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতেই দেড় বছরের বেশি সময় লাগছে। এতে প্রতিবছর সেশনজট বাড়ছে। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ড. এবিএম আজিজুর রহমান বলেন, শিক্ষক নিয়োগ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয়। কয়েকটি বিভাগ শিক্ষক চাহিদা জানিয়েছে। প্রশাসন দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করবে।উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, নিয়োগের বিষয়টি দীর্ঘদিন নীতিমালা ও প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে ছিল। শিক্ষক ও জনবলের ঘাটতি পূরণে চাহিদা অনুযায়ী ইউজিসির অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। সেশনজট কমাতে একাডেমিক ক্যালেন্ডার করা হয়েছে।

শিক্ষাছুটিতে গিয়ে ফেরেননি ৭৫ জন : বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচিং শাখার তথ্য বলছে, বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও পিএইচডিসহ বিভিন্ন কারণে ১১০ জন শিক্ষক শিক্ষাছুটিতে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৭৫ জন ছুটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কাজে ফেরেননি। এর মধ্যে ২৪ জনের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেওয়া ডিফল্টারের অর্থ ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

গাছতলায় ক্লাস : প্রতি বছর শিক্ষার্থী বাড়লেও অনেক বিভাগে শ্রেণিকক্ষের সংকট তীব্র। ১৫ বছর আগে চালু হওয়া আইন ও বিচার বিভাগের ছয় ব্যাচের ৩৭০ শিক্ষার্থীর জন্য নিজস্ব কোনো শ্রেণিকক্ষ নেই। আট বছর আগে চালু হওয়া তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটের সাত ব্যাচের ২৪৫ শিক্ষার্থীর জন্য শ্রেণিকক্ষ মাত্র দুটি। ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের চার বিভাগের ১ হাজার ৫৪৩ শিক্ষার্থীর জন্য শ্রেণিকক্ষ রয়েছে ১২টি। ইংরেজি, ইতিহাস, জার্নালিজমসহ বিভিন্ন বিভাগেও শ্রেণিকক্ষ ও ল্যাব সংকট রয়েছে। অন্য বিভাগের কক্ষ ধার করে, এমনকি জহির রায়হান মিলনায়তনেও ক্লাস নিতে হয়। কখনো গাছতলায়ও চলছে পাঠদান। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প চলছে। নতুন হল, প্রশাসনিক ও কয়েকটি একাডেমিক ভবন নির্মাণ হলেও সংকটে থাকা এসব বিভাগের জন্য পৃথক একাডেমিক ভবন রাখা হয়নি। প্রকল্প কার্যালয়ের উপ-প্রধান প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন, নির্মাণাধীন লেকচার থিয়েটার ও কলা ও মানবিক অনুষদের ভবনের কাজ শেষ হলে শ্রেণিকক্ষ সংকট অনেকটা কমবে।

হল ছাড়ছেন না সাবেক শিক্ষার্থীরা : স্নাতকোত্তর শেষ হলেও র‌্যাগ না হওয়ায় অনেক সাবেক শিক্ষার্থী হলে অবস্থান করছেন। ছেলেদের ১১টি হলের মধ্যে নয়টিতে ৪৫ ও ৪৬ ব্যাচের সহস্রাধিক সাবেক শিক্ষার্থী রয়েছেন বলে হল দপ্তরগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এতে নতুন শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট আরও বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী, চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাত দিনের মধ্যে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার কথা। আইন অমান্য করলে ফল প্রকাশ স্থগিত রাখার বিধান রয়েছে। কিন্তু এসব আইন কাগজে থাকলেও বাস্তবে দেখা মিলছে না।

‘নাপা সেন্টার’ চিকিৎসাকেন্দ্র : নিম্নমানের চিকিৎসাসেবার কারণে শিক্ষার্থীদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র চিকিৎসাকেন্দ্রটি ‘নাপা সেন্টার’ নামে পরিচিত। সেখানে অভিজ্ঞ চিকিৎসক, প্রয়োজনীয় জনবল, ওষুধ ও সরঞ্জামের সংকট তীব্র। রোগী ভর্তির জন্য কোনো বেড বা নার্সও নেই। সাধারণত নাপা, হিস্টাসিন, চুলকানির মলমসহ কিছু ওষুধ পাওয়া যায়। গত ৩০ জুন থেকে ২১ জুলাই-২১ দিনের ব্যবধানে চিকিৎসাকেন্দ্রের মজুত থেকে ১৯ হাজার ৫৬৭টি ওষুধ উধাও হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ইসিজি মেশিন ও অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ কিছু সরঞ্জাম শিক্ষার্থীরা অনুদানের মাধ্যমে সংগ্রহ করে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। উপপ্রধান মেডিকেল অফিসার শামসুল আলম খান লিটন বলেন, অবকাঠামো, জনবল ও বাজেট সংকটের বিষয়টি প্রশাসনকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে প্রশাসন।

মানসিক স্বাস্থ্যসেবাতেও সংকট : প্রায় ১৩ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য নেই পূর্ণাঙ্গ কাউন্সেলিং সেন্টার। টিএসসির দ্বিতীয় তলায় কোনোভাবে চলছে শিক্ষার্থী কল্যাণ ও পরামর্শদান কেন্দ্র। পর্যাপ্ত মনোবিজ্ঞানী ও নিরিবিলি পরিবেশ না থাকলেও গত ছয় বছরে এখান থেকে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়েছেন ২ হাজার ৫৬২ শিক্ষার্থী। গত দুই বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে।

অটোমেশন না থাকায় প্রশাসনিক ভোগান্তি : জনবল সংকটে একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট, নম্বরপত্র ও সনদ সংগ্রহে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিয়ত দীর্ঘসূত্রতায় পড়তে হচ্ছে। এমনকি একটি পরীক্ষায় অংশ নিতে আবেদনপত্র, হলের ছাড়পত্র, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ছাড়পত্র, বিভাগীয় সভাপতির স্বাক্ষর ও টাকা জমার রসিদ সংগ্রহ করতে হয়। এতে ১৫-২০ দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ- আবেদনপত্র জমা দিলেও বারবার আসতে হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights