ভূরাজনীতির জটিল সমীকরণে বাংলাদেশ

এম এ আজিজ

১৮ সেপ্টেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ১০১টি চুক্তি ও এমওইউ পর্যালোচনার বিষয়ে দিল্লিকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তিনি বলেন, ভারত তার স্বার্থরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। এর আগে ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানান, আগের সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে করা ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা পর্যালোচনা করছে সরকার। এটি ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের নীতিগত পুনর্মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। ২০২৩ সালে বাংলাদেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনকেন্দ্রিক চাপ, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং ভারতের নিরাপত্তাগত স্বার্থ যে ভূরাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছিল, ২০২৬ সালে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা পর্যালোচনার উদ্যোগ। ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এখন ওয়াশিংটন, বেইজিং ও নয়াদিল্লির স্বার্থ, উদ্বেগ এবং পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রভাব একসঙ্গে বিবেচনার প্রয়োজন আরও স্পষ্ট হয়েছে।

ঢাকা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি সামনে রেখে কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা না বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারতসহ সব বৃহৎ শক্তির সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থ ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায়। এর লক্ষ্য হলো জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ন রেখে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন সহযোগিতার সুযোগ বাড়ানো এবং বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।

বর্তমানে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের পরিধি অনেক বিস্তৃত হয়েছে। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দুই দেশ ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ স্বাক্ষর করে। চুক্তিতে দুই দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক, বাজার প্রবেশ ও বাণিজ্য বাধা নিয়ে পারস্পরিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর প্রস্তাবনায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কের পাশাপাশি জাতীয় ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে বাণিজ্যিক সহযোগিতাকে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। ফলে অর্থনীতি এখন সম্পর্কটির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এই পরিবর্তনের অর্থ হলো, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে শুধু ২০২৩ সালের রাজনৈতিক চাপের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। রপ্তানি বাজার, শুল্ক, সরবরাহশৃঙ্খল, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও জ্বালানি এখন সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নিজের অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থকে বাণিজ্যনীতির সঙ্গে যুক্ত করছে। বাংলাদেশের জন্যও তাই ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিকগুলো পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন, যাতে একটির কারণে অন্যটি অযথা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও ২০২৬ সালে নতুন পর্যায়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২২ থেকে ২৬ জুন চীন সফর করেন। সফরে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়। যৌথ ঘোষণায় দুই দেশ ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের চীন-বাংলাদেশ সম্প্রদায়’ গঠনের দিকে সম্পর্ক উন্নীত করার সিদ্ধান্ত জানায়। পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপ এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে সম্ভাব্য ‘টু-প্লাস-টু’ সংলাপের কথাও বলা হয়েছে। চীনের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রও বিস্তৃত হয়েছে। দুই দেশ বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প ও সরবরাহশৃঙ্খল, যোগাযোগ, প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি, কৃষি, শিক্ষা এবং মানবসম্পদে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা জানিয়েছে। মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়নের বিষয়ও যৌথ ঘোষণায় রয়েছে। তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের সম্ভাব্য সহযোগিতাও আলোচনায় এসেছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বিনিময়, সফর ও প্রশিক্ষণ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। তবে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হওয়াকে বাংলাদেশের কোনো চীনকেন্দ্রিক সামরিক বা রাজনৈতিক জোটে যোগদানের প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং বর্তমান নীতিতে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বড় অবকাঠামো, ঋণ, বন্দর, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতার সম্ভাবনা থাকলে তার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব মূল্যায়ন প্রয়োজন। জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সম্পর্কের গভীরতার পাশাপাশি নির্ভরতার মাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি বড় বাস্তবতা হলো বাণিজ্য ঘাটতি। জুনের চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের কাছে বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয় তুলেছেন। একই সময়ে তিনি অবকাঠামো প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। অর্থাৎ চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের লক্ষ্য শুধু রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা নয়; রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন প্রকল্প থেকেও বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করা।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি দুই দেশের সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে আছে। এর পাশাপাশি সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা এবং নদীর পানিবণ্টনের প্রশ্ন রয়েছে। ফলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে শুধু যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার উপাদান হিসেবে দেখলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নিজস্ব বাস্তবতাগুলো আড়ালে পড়ে যায়।

১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনার বিষয়টি এই প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, সরকার সব চুক্তি পর্যালোচনা করছে এবং জাতীয় স্বার্থ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তিনি চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের কিছু ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তবে কোন চুক্তি বাতিল, সংশোধন বা বহাল থাকবে-এ বিষয়ে সরকার এখনো চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেনি। তাই পর্যালোচনার সম্ভাব্য ফল সম্পর্কে আগাম সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।

ভারতের প্রতিক্রিয়াও এখন পর্যন্ত সতর্ক। রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, এ বিষয়ে দিল্লিকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি এবং ভারত তার স্বার্থরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। এই বক্তব্যকে চুক্তি বাতিলের বিরুদ্ধে সরাসরি হুমকি হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ সীমিত; বরং এটি ভারতের দ্বিপক্ষীয় স্বার্থরক্ষার অবস্থান হিসেবে দেখা যায়। একই ব্রিফিংয়ে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়েও তিনি বলেন, দ্বিপক্ষীয় ও কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা চলবে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক শুধু চুক্তির সংখ্যায় নির্ধারিত হয় না। প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার সীমান্ত, বাণিজ্য, পরিবহন, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা, নদীর পানি এবং সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনযাত্রা-সবই সম্পর্কের অংশ। গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদও ডিসেম্বর ২০২৬-এ শেষ হওয়ার কথা। ফলে ১০১টি চুক্তির পর্যালোচনার পাশাপাশি পানিবণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও ঢাকাকে সমান্তরালভাবে কাজ করতে হবে।

ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের সম্ভাব্য সহযোগিতা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের নিকটবর্তী বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান-দুটিই নয়াদিল্লির জন্য প্রাসঙ্গিক। চীন অবশ্য তিস্তা প্রকল্পকে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও জীবনজীবিকার প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরছে। ফলে ঢাকা কোনো প্রকল্পে বিদেশি অংশীদার নির্বাচন করার সময় কেবল অর্থায়ন বা প্রযুক্তি নয়, প্রতিবেশী দেশের নিরাপত্তা উদ্বেগ, পরিবেশ, সার্বভৌমত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ও বিবেচনায় নিতে পারে।

বাংলাদেশের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি এই পরিস্থিতিতে একটি নীতিগত কাঠামো দিতে পারে। কিন্তু এ নীতি কার্যকর করতে হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি করার আগে অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা, ঋণের শর্ত, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা, নিরাপত্তাঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ দায় যাচাই করা দরকার। একইভাবে পুরোনো চুক্তি পর্যালোচনাতেও রাজনৈতিক আবেগের বদলে আইন, নথি, অর্থনৈতিক ফলাফল ও জাতীয় স্বার্থের নির্দিষ্ট মানদণ্ড প্রয়োগ করা প্রয়োজন। জ্বালানি নিরাপত্তাও এই ভূরাজনৈতিক সমীকরণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ এলএনজি ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য বাড়ানো যেমন একটি সম্ভাব্য সরবরাহ বিকল্প, তেমনি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, অবকাঠামো উন্নয়ন, সরবরাহকারী বহুমুখীকরণ এবং কৌশলগত মজুত গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নটি তাই পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে চলে এসেছে। চীন বাংলাদেশের বড় বাণিজ্য অংশীদার এবং অবকাঠামো বিনিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে; যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার ও নতুন বাণিজ্য অংশীদার। ভারতের সঙ্গে রয়েছে স্থল ও সমুদ্র যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, বাণিজ্য এবং সীমান্ত অর্থনীতি। এই তিন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের প্রকৃতি এক নয়। তাই একই মাপকাঠিতে তিনটি সম্পর্ককে বিচার না করে খাতভিত্তিক জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণ করাই অধিক কার্যকর পদ্ধতি।

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রশ্নও বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক হিসাবকে আরও বিস্তৃত করেছে। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের উদ্যোগে গঠিত প্রতিরক্ষা কাঠামোতে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে যুক্ত হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়নি। তবে এমন কোনো উদ্যোগে অংশগ্রহণের প্রশ্ন উঠলে তার প্রভাব শুধু মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে সীমিত থাকবে না। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক হিসাবেও বিষয়টি বিবেচিত হবে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ কোনো একটি নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক জোটে আটকে পড়েছে-এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানো যায় না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ, চীনের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং ভারতের নিরাপত্তা ও দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ একই সময়ে সক্রিয়। ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার বিষয়টি এই বহুমুখী সমীকরণকে আরও দৃশ্যমান করেছে। এর ফল কী হবে, তা নির্ভর করবে পর্যালোচনার মানদণ্ড, সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা এবং পরবর্তী কূটনৈতিক আলোচনার ওপর।

বাংলাদেশের সামনে তাই মূল প্রশ্ন কোনো একটি শক্তির পক্ষে যাওয়া নয়; বরং প্রত্যেক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্কের পৃথক মূল্যায়ন করা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাজার ও বিনিয়োগ, চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও বাণিজ্য, ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশী সম্পর্ক ও সংযোগ-প্রতিটি ক্ষেত্রের নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে। জাতীয় স্বার্থরক্ষার অর্থ সম্পর্ক কমিয়ে দেওয়া নয়; বরং এমনভাবে পরিচালনা করা, যাতে সহযোগিতা বাড়ে কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা অযথা সংকুচিত না হয়।

‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’-বাংলাদেশের এই দীর্ঘদিনের নীতির বাস্তব পরীক্ষা এখন আরও কঠিন। বড় শক্তির প্রতিযোগিতা থেকে নিজেকে পুরোপুরি দূরে রাখা সম্ভব নয়; একই সঙ্গে কোনো একটি শক্তির কৌশলগত হিসাবের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত হওয়াও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই প্রয়োজন বাস্তববাদী কূটনীতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ চুক্তি, অর্থনৈতিক হিসাব এবং নিরাপত্তাগত মূল্যায়নের সমন্বয়। এই ভারসাম্যই বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের মূল পরীক্ষা।

♦ লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights