সমস্যায় জর্জরিত প্রাচীন ক্যাম্পাস

তাসনিম আহমেদ, শেকৃবি

দেশের সর্বপ্রাচীন কৃষি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি)। ১৯৩৮ সালে বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট হিসেবে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি ২০০১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয়। ৮৮ বছরেও আবাসন, শ্রেণিকক্ষ, গবেষণা, পরিবহন ও একাডেমিক ব্যবস্থাপনার নানা সংকট কাটেনি। ছয় হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর চাপে পুরোনো অবকাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাতেও দেখা দিয়েছে নানা সমস্যা।

কম ভাড়ার দোকান, বেশি দামে পণ্য : বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ফটকসংলগ্ন বাজারে ২০টি দোকান ও ১৪টি কাঁচাবাজারের স্টল রয়েছে। শিক্ষার্থীসহ আশপাশের প্রায় ১০ হাজার মানুষ এ বাজারের ওপর নির্ভরশীল। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের নামে মাসে ২ হাজার টাকা ভাড়ায় বরাদ্দ দেওয়া বড় দোকান এবং ১ হাজার টাকা ভাড়ার স্টল তৃতীয় পক্ষের কাছে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায় ভাড়া দেওয়া হয়েছে। দোকানপ্রতি দেড় থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানত নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, এসব অতিরিক্ত খরচ পুষিয়ে নিতে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। ফলে মাছ ও মুরগি প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।

হঠাৎ পরীক্ষা স্থগিত : সিলেবাস শেষ না হওয়া, ক্লাসের ঘাটতি, রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিংবা অনিবার্য কারণে শেকৃবিতে পরীক্ষা পেছানো ও হঠাৎ পরীক্ষাসূচি পরিবর্তনের ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে। এতে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি একাডেমিক ক্যালেন্ডার পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। সর্বশেষ গত ৬ আগস্ট এজিইসি ৩৩৩ কোর্সের পরীক্ষা শুরুর ঠিক আগে স্থগিত করা হয়। শিক্ষার্থীদের দাবি, ৫ আগস্টের ফিস্টের খাবার খেয়ে কয়েকজন অসুস্থ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে হঠাৎ এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

খাতা মূল্যায়নে বিলম্ব : উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও ফল প্রকাশে বিলম্বের কারণে সেমিস্টার ও একাডেমিক ক্যালেন্ডার পিছিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। তৃতীয় বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের পরীক্ষা শেষ হয় ১৯ নভেম্বর ২০২৫। ফল প্রকাশ করা হয় প্রায় তিন মাস পর, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। শিক্ষার্থী আরাফাত আলম বলেন, ফল প্রকাশে দেরি হওয়ায় পরবর্তী সেমিস্টার পিছিয়ে যাচ্ছে। এতে গ্র্যাজুয়েশন, চাকরি ও উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ইন্টার্নশিপের সুযোগ নেই : সাধারণ কৃষি বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক ইন্টার্নশিপের সুযোগ না থাকায় ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আধুনিক খামার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি কৃষি খাতে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ ছাড়াই অনেক শিক্ষার্থী স্নাতক শেষ করছেন।

পুরোনো ভবনে ঝুঁকি, আবাসন সংকট : শ্রেণিকক্ষে মাল্টিমিডিয়া ও সাউন্ড সিস্টেমের ঘাটতি, পর্যাপ্ত ওয়াশরুম ও কমনরুমের অভাবের পাশাপাশি পুরোনো ভবনের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। কৃষি অনুষদের শ্রেণিকক্ষে ক্লাস চলাকালে পলেস্তারা খসে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। শেরেবাংলা হলের ৩০২ নম্বর কক্ষের ছাদ ধসে এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী আহত হওয়ার পর একই ব্লকের আরও কয়েকটি কক্ষের ছাদের অংশ ধসে পড়ে বলে জানা গেছে। এদিকে ছাত্রীদের তুলনায় আবাসন সুবিধা পর্যাপ্ত না হওয়ায় তাদেরও আবাসন সংকট রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. বেলাল হোসেন বলেন, খাতা মূল্যায়ন ও নম্বর ইনপুটের প্রক্রিয়া অনলাইনে নেওয়া হচ্ছে। এতে নম্বর জমা দেওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকবে এবং দীর্ঘসূত্রতা কমবে। পরীক্ষা পেছানোর ঘটনাকে অনাকাক্সিক্ষত উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে প্রশাসন ও শিক্ষার্থী-উভয়েরই দায় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আবদুল লতিফ বলেন, মিনি বাজারের দোকানগুলো বন্ধ করে নতুন করে বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইন্টার্নশিপ চালুর বিষয়ে ইউজিসির নেতৃত্বে নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। কৃষি অনুষদ এনেক্স ও শেরেবাংলা হল সংস্কার এবং ছাত্রীদের জন্য নতুন হল নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্প যাচাই করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights