যে কারণে পাহাড়ি অঞ্চলে আধিপত্য বাড়াতে মরিয়া হুতি

অনলাইন ডেস্ক

ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলকে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর শেষ নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলো থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে নতুন করে কৌশলগত পাহাড়ি অঞ্চলগুলোর দখল নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধারা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ মুহূর্তে হুতির ওপর নির্ধারিত বিমান হামলা বাতিল করার খবরের পরপরই সোমবার পাহাড়ি এলাকায় লড়াই জোরদার করেছে গোষ্ঠীটি। চলতি মাসে গোষ্ঠীটির এই ঝটিকা অভিযান সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে এক নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে রূপ দিয়েছে এবং বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তাকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলেছে।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত ইয়েমেনের এই যুদ্ধে সরাসরি যোগ দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আসছে। এরই মাঝে শনিবারে হুতি দাবি করেছে, তারা সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে হামলা চালিয়েছে। ওই দিন রিয়াদ বিমানবন্দরের কাছে জোরালো বিস্ফোরণের শব্দ এবং ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। সংঘাত নতুন করে উত্তপ্ত হওয়ার পর এটিই রিয়াদে প্রথম সম্ভাব্য আক্রমণ হলেও এ বিষয়ে এখনও কোনো মন্তব্য করেনি সৌদি আরব।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি যুবরাজের আকুল আবেদনের পর রবিবার ট্রাম্প প্রশাসন হুতির ওপর বিমান হামলা চালানোর পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েছিল। এমনকি মার্কিন সামরিক বিমানে বোমা লোড করার কাজও শেষ হয়ে এসেছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ওই হামলা স্থগিতের নির্দেশ দেন। রয়টার্স অবশ্য স্বাধীনভাবে এই প্রতিবেদনের সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনের রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণে থাকা হুতিরা এই মাসের শুরুতে এক ঝটিকা অভিযানের মাধ্যমে দেশের লোহিত সাগর উপকূলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেয়। এতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও সৌদি-সমর্থিত দক্ষিণভিত্তিক ইয়েমেনি সরকারের বাহিনী সেখান থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়। হুতিদের দাবি অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সৌদি আরব পাহাড়ি এলাকায় তাদের অবস্থান লক্ষ্য করে শত শত বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে রাজকীয় বিমান বাহিনীর এই আকাশপথের প্রাধান্য হুতিদের অগ্রসর হওয়া থামাতে পারছে না, বরং সৌদি-সমর্থিত বাহিনীগুলো একের পর এক ক্ষেত্র ছেড়ে পিছিয়ে যাচ্ছে।

জাতিসংঘের হিসাব মতে, সংঘাতের এই নতুন দাবানলে এ পর্যন্ত প্রায় ৭০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি ইয়েমেনি গৃহহীন হয়ে দেশের ভেতরেই স্থানচ্যুত হয়েছেন এবং আরও হাজার হাজার মানুষ লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে আফ্রিকার দেশগুলোতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

ইয়েমেনের পাঁচটি সামরিক সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, হুতি এখন তায়েজ ও লাহিজ প্রদেশের মধ্যবর্তী ‘কাহবুব পাহাড়’ হিসেবে পরিচিত কৌশলগত উচ্চভূমির দখল নিতে চাইছে। এই পাহাড়ি অঞ্চলটি লোহিত সাগর উপকূলকে দক্ষিণ অঞ্চলের সরকারি ঘাঁটিগুলো থেকে আলাদা করে রেখেছে। বর্তমানে প্রধান সংঘাত কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে তায়েজ প্রদেশের দুর্গম পাহাড়ি অল-ওয়াজিয়াহ জেলার বহিরাঞ্চল এবং লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার থেকে ভারত মহাসাগরের উপকূলবর্তী রাস আল-আরা অঞ্চল।

হুতির মূল উদ্দেশ্য হলো বাব আল-মান্দেব প্রণালির চারপাশে নিজেদের অবস্থান নিরাপদ করা। এই পাহাড়ি উচ্চভূমিগুলো দখলে নিতে পারলে তারা নতুন নতুন যুদ্ধের ফ্রন্ট খুলতে পারবে। একই সাথে লোহিত সাগরের ধুবাব এবং প্রণালিতে অবস্থিত পেরিম দ্বীপে তারা যেসব এলাকা দখল করেছে, সেগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে সুবিধা পাবে।

সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে এই যুদ্ধের নতুন উত্তাপ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য নতুন এক সংকট তৈরি করেছে। একদিকে ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরবকে রক্ষা করার চাপ, অন্যদিকে ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা অত্যন্ত বিতর্কিত যুদ্ধকে আরও বড় করতে না চাওয়ার অনিচ্ছা; দুইয়ের মাঝে পড়েছে ওয়াশিংটন। ২০১৫ সালের শুরুর দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হুথিদের ওপর টানা দুই মাস বোমা বর্ষণ করলেও একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর ট্রাম্প তা বন্ধ করেন এবং তারপর থেকে এই সংঘাত থেকে দূরেই থেকেছেন।

তবে বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে হুতিদের নতুন নিয়ন্ত্রণ সৌদি আরবের তেল রপ্তানির বিকল্প পথের জন্য বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে, যা হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হলে ব্যবহার করা হতো। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সৌদি আরব এখন হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলের চালান বাড়িয়ে দিয়েছে। যুদ্ধকালীন ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সর্বোচ্চ চড়া ভাড়ায় কিছু ট্যাংকার ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে রিয়াদ থেকে তেল সংগ্রহ করছে এবং ভারত মহাসাগরে গিয়ে অন্যান্য জাহাজে সেই তেল স্থানান্তরিত করছে। কৃত্রিম উপগ্রহের উপাত্ত অনুযায়ী, হরমুজে সৌদি তেল রপ্তানি দৈনিক ২.৯ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছেছে, যা গত আগস্টেও ছিল মাত্র ৭ লাখ ব্যারেল।

এই পদক্ষেপ বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামকে ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলারের কাছ থেকে কমিয়ে ১০০ ডলারের কাছাকাছি ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের ভোক্তা এবং শিল্পখাতগুলোকে এখনো পরিশোধিত জ্বালানির জন্য রেকর্ড মূল্য গুনতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের খুচরা মূল্য বেড়ে প্রতি গ্যালন ৬.৫১ ডলারে পৌঁছেছে, যা ট্রাম্পের জন্য আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিকভাবে চরম অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধ শুরুর আগে এর দাম ছিল ৩.৭৫ ডলার।

সামুদ্রিক নিরাপত্তাজনিত সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের মুখে একটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র জাতীয় বস্তু আঘাত হেনেছে, যাতে কয়েকজন ক্রু সামান্য আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অর্জিত অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা ভেস্তে যাওয়ার পর কূটনৈতিক উদ্যোগ থমকে আছে। এমন পরিস্থিতিতেই জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে মঙ্গলবার নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হচ্ছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্পের অপারেশন এপিক ফিউরি শুরু হওয়ার পর জাতিসংঘের সদর দফতরে এটিই কোনো ইরানি রাষ্ট্রপ্রধানের প্রথম সফর হতে যাচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights