লাল শাপলার স্বপ্নরাজ্য

সাইদ মেমন, বরিশাল

যত দূর চোখ যায়, তত দূর ফুটে আছে লাল শাপলা। সবুজের মাঝে লাল শাপলার এই স্বর্গরাজ্য দেখতে প্রতিদিনই ছুটে আসছে প্রকৃতিপ্রেমীরা। বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলা বিল এখন শুধু সৌন্দর্যের আকর্ষণ নয়, স্থানীয় মানুষের আয়েরও অন্যতম উৎস। বরিশাল নগরী থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে উজিরপুর উপজেলার সাতলা বিলের আয়তন ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার একর। সারা বছরই সাতলার বিলে পানি থাকে। বর্ষা মৌসুমে বিল পানিতে টইটম্বুর থাকে। জুলাই মাসে লাল শাপলা ফোটে এ বিলে। লাল শাপলা আর চারপাশে সবুজ। পানকৌড়ি, বক, মাছরাঙা পাখির মাছ শিকারের সতর্ক অবস্থান, ফিঙে, শালিক, দোয়েল, চড়ুই, কাঠঠোকরাসহ বিভিন্ন পাখি ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য। মায়াবী এ রূপের টানেই প্রতি বছর দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসে হাজারো মানুষ। আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু সাতলা বিলে শুধু লাল শাপলার মৌসুমেই নয়, অকৃত্রিম গ্রামের সৌন্দর্য উপভোগ করতে সারা বছরই যেন পর্যটক আসে, সেই উদ্যোগ নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতিতে লাল শাপলা একটি বড় ভূমিকা রাখছে। শাপলার মৌসুমে গ্রামের নৌকার মাঝি, বিভিন্ন যানবাহন, দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বেচাবিক্রি জমজমাট থাকে।

শাপলা উত্তোলন করে বিক্রি করে অর্থ আয় করেন স্থানীয়রা। তাই সাতলার বিলের লাল শাপলা ঘিরে একটা গ্রামীণ পর্যটন এলাকা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শুধু তিন মাস নয়, গ্রামীণ পরিবেশ উপভোগ করতে যেন সারা বছরই এখানে পর্যটক আসতে পারে, সেজন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় নৌকার মাঝি চয়ন হাওলাদার বলেন, শাপলা ফোটার সময় প্রতিদিন অনেক মানুষ আসে। পর্যটক বাড়লে নৌকা চালানো, খাবারের দোকান ও স্থানীয় পণ্য বিক্রি-সবকিছুর ব্যবসা বাড়বে। অনেক পরিবার এ থেকে আয় করতে পারবে। প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার পর্যটক আসে। শুক্র ও শনিবার এ সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়িয়ে যায়। নৌকায় ঘুরতে প্রতি ঘণ্টা ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়। একটি নৌকায় চার থেকে পাঁচজন করে নেওয়া হয়। দিনে তাঁদের সম্মিলিত দৈনিক আয় দাঁড়ায় প্রায় ৫০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা। জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাস নৌকা চলাচলের হিসাব অনুযায়ী মৌসুমে মোট আয় হয় ৬০ থেকে ৯০ লাখ টাকা। শুধু নৌকা ভাড়াই নয়, বিলের লাল শাপলাও এখন স্থানীয় অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠেছে। শাপলা তোলার কাজে নিয়োজিত রয়েছে স্থানীয় শতাধিক পরিবার-যার একটি বড় অংশই নারী। দিনভর বিল থেকে শাপলা সংগ্রহ করে ওই সব নারী গড়ে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। তাঁদের কাছ থেকে পাইকাররা এসব শাপলা কিনে নিয়ে শহরসহ বিভিন্ন হাটবাজারে প্রতি মুঠো ১০ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি করেন।

পাইকারি শাপলা বিক্রেতা দীনেশ ঠাকুর বলেন, ‘আমরা বিলের সংগ্রাহকদের কাছ থেকে সরাসরি শাপলা কিনে উজিরপুর, বরিশাল শহরসহ বিভিন্ন হাটবাজারে নিয়ে বিক্রি করি।’ স্থানীয় আবদুল মান্নান বেপারী বলেন, ‘আমাদের ছোটবেলা থেকেই এই বিলে শাপলা ফুটতে দেখি। আগে মানুষ তেমন আসত না। এখন প্রতি বছর শাপলা ফোটার মৌসুমে দূরদূরান্ত থেকে পর্যটক আসে।’ উজিরপুরের সাংবাদিক জুনায়েদ সিয়াম বলেন, বিলে ৮-১০ ফুট পানি রয়েছে। অনেক পর্যটক সাঁতার জানে না। এজন্য অন্তত প্রতি শুক্র ও শনিবার ফায়ার সার্ভিস ও একটি মেডিকেল টিম রাখা জরুরি। এই দুই দিন উপজেলা প্রশাসন থেকে একটি মনিটরিং টিম আসে। তাই এখন আর আগের মতো বাড়তি অর্থ নেওয়ার বিষয়টি নেই। এই টিম নিয়মিত মনিটরিং করলে পর্যটকরা আরও স্বাচ্ছন্দবোধ করবে। পর্যটক আরও বাড়বে। বরিশাল-২ (বানারীপাড়া-উজিরপুর) আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এস সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু বলেন, প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ঘেরা এ বিলকে আরও দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয় করে গড়ে তুলতে আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র বিনির্মাণে ইতোমধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করে লাল শাপলার এ বিলকে দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights