সুশান্তের ম্যানেজার দিশা সালিয়ানের মৃত্যু মামলায় ফের তদন্ত, নেপথ্যে যে কারণ
বলিউড অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর কয়েক দিন আগেই প্রাণ হারিয়েছিলেন তার সাবেক ম্যানেজার দিশা সালিয়ান। প্রথমে দুর্ঘটনা, পরে আত্মহত্যা দুই ধরনের ব্যাখ্যাই সামনে এসেছিল তার মৃত্যুকে ঘিরে। তবে ছয় বছর পর সেই মামলাতেই নতুন মোড় এসেছে। মুম্বাই হাইকোর্টের নির্দেশে দিশার মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে তদন্ত করছে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা।
২০২০ সালের জুনে করোনাভাইরাসের ভয়াবহ সময়ের মধ্যেই মৃত্যু হয় দিশার। মৃত্যুর আগে একটি বিজ্ঞাপনচিত্রের শুটিং নিয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত ছিলেন তিনি। অগ্রিম পারিশ্রমিক হিসেবে পাওয়া একটি চেকের ছবিও মা-বাবাকে দেখিয়েছিলেন। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় জানিয়েছিলেন, দুই দিনের মধ্যেই ফিরে আসবেন।
কিন্তু ৮ ও ৯ জুনের মধ্যবর্তী রাতে তার বাবা সতীশ সালিয়ানকে হাসপাতালে ডেকে পাঠায় পুলিশ। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, মুম্বাইয়ের একটি ভবনের ১২ তলা থেকে পড়ে দিশার মৃত্যু হয়েছে।
ঘটনার পর দিশার কয়েকজন বন্ধু পুলিশকে জানান, তিনি মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন এবং দুর্ঘটনাবশত নিচে পড়ে যান। পরে পুলিশ তদন্ত করে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করে। তবে শুরু থেকেই এই ব্যাখ্যা মেনে নেননি দিশার বাবা।
সতীশ সালিয়ানের দাবি, তার মেয়ের মৃত্যু দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যা নয়; তাকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এমনকি প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তি ও রাজনীতিককে রক্ষা করতে পুলিশের কিছু কর্মকর্তা আলামত নষ্ট করে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
গত বছরের করা একটি রিট আবেদনের পর বিষয়টি ফের আদালতের নজরে আসে। চলতি মাসের ২ সেপ্টেম্বর মুম্বাই হাইকোর্টের বিচারক সারং ভি কোটিয়াল ও রঞ্জিতসিনহা রাজা ভোঁসলের বেঞ্চ মামলাটি নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেন। আদালত আগের তদন্তে একাধিক অসংগতি থাকার কথা উল্লেখ করেছে।
বিচারকদের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ছয় বছরের বেশি সময় ধরে দুই ধাপে চলা তদন্তে এমন কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে, যার উত্তর পাওয়া যায়নি। পুলিশের তদন্ত বরং উত্তর দেওয়ার চেয়ে আরও বেশি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তারা।
আদালত আরও উল্লেখ করে, ঘটনাস্থলে দেহ পড়ার পর সেখানে রক্তের চিহ্ন না পাওয়া এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা আঘাতের ধরন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পুলিশের নথি তৈরিতে অস্বাভাবিক বিলম্বের বিষয়টিও আদালতের নজরে আসে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুলিশ শুরুতে ঘটনাটিকে সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে তদন্ত করলেও কোনো এফআইআর করেনি। আদালতের নির্দেশের পর দিশার বাবার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা নতুন করে এফআইআর নথিভুক্ত করেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, দিশা একটি তারকা ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন এবং সুশান্ত সিং রাজপুতের প্রতিনিধিত্ব করতেন। দিশা কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির কথিত বেআইনি কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন এবং সেই তথ্য সুশান্তকে জানিয়েছিলেন-এমন দাবি করেছেন তার বাবা। অভিযোগ অনুযায়ী, বিষয়টি প্রকাশ্যে আনার জন্য তারা সংবাদ সম্মেলন করার পরিকল্পনাও করেছিলেন।
সতীশ সালিয়ানের দাবি, বিষয়টি জানতে পেরে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা দিশাকে চুপ করিয়ে দিতে ষড়যন্ত্র করেন। তার অভিযোগ, দিশাকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয় এবং পরে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে আলামত গোপন ও বিকৃত করা হয়।
তবে এসব অভিযোগ এখনো অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে। আদালতও স্পষ্ট করেছে, এফআইআর নথিভুক্ত হওয়া কারও অপরাধ প্রমাণ করে না। তদন্তে পর্যাপ্ত ভিত্তি পাওয়া গেলেই কেবল কাউকে অভিযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
দিশার মৃত্যুর কয়েক দিনের মধ্যেই নিজ বাড়িতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় সুশান্ত সিং রাজপুতকে। তার মৃত্যুকেও প্রথমে আত্মহত্যা বলে জানায় পুলিশ। পরে ব্যাপক আলোচনার মধ্যে মামলাটি কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সংস্থাটি পরবর্তীতে মামলাটি বন্ধ করে জানায়, সুশান্ত আত্মহত্যা করেই মারা গেছেন এবং তার মৃত্যুর ঘটনায় অভিনেত্রী রিয়া চক্রবর্তী বা তার পরিবারের কোনো ভূমিকা পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, দিশার বাবার নতুন অভিযোগে দুই মৃত্যুর মধ্যে সরাসরি যোগসূত্রের দাবি করা হয়েছে। ফলে দীর্ঘ ছয় বছর পর দিশার মৃত্যুর ঘটনা আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। মামলায় রাজনীতিক, পুলিশ কর্মকর্তা ও বলিউডের কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তির নাম থাকায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
মেয়ের মৃত্যুর নতুন তদন্তের নির্দেশে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন সতীশ সালিয়ান। ছয় বছর ধরে মেয়ের জন্য ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে আসা এই বাবা বলেন, দিশা ছিল তাদের একমাত্র সন্তান। পড়াশোনায় ভালো, বই পড়তে ভালোবাসা এবং পরোপকারী মেয়েটিকে হারানোর শোক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি।
মেয়ের মৃত্যুর জন্য দায়ীদের কঠোরতম শাস্তি চান সতীশ। তিনি জানান, দিশার জন্য ন্যায়বিচার পাওয়াই এখন তার জীবনের সবচেয়ে বড় দাবি।
সূত্র: বিবিসি
