নীরবে বেপরোয়া ঘুষ

আরাফাত মুন্না

ফাইল নড়াতে ঘুষ, স্বাক্ষর করাতে ঘুষ, নামজারিতে ঘুষ, ভোটার হতে ঘুষ, পেনশনের টাকা তুলতেও ঘুষ। অনেক ক্ষেত্রেই নীরবে, আড়ালে কিংবা মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে চলছে এ লেনদেন। কোথাও নির্দিষ্ট অঙ্ক, কোথাও আবার কাজের গুরুত্ব ও তদবিরের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হচ্ছে ঘুষের পরিমাণ। দেশে সরকার বদলেছে, প্রশাসনে সংস্কারের আলোচনা চলছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর বার্তাও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা বলছে, ঘুষের সংস্কৃতি এখনো বহাল। ভূমি অফিস থেকে পুলিশ, বিআরটিএ, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে হাসপাতাল, বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে কর অফিস-অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেবা পেতে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি ফি ১ হাজার টাকা হলেও ঘুষ দাবি করা হচ্ছে ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার কয়েক দিন আগে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সম্প্রতি ঘুষ ও দুর্নীতি নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। মির্জা ফখরুল বলেছেন, ‘ঘুষ ও দুর্নীতি কিছুই বদলায়নি, সব আগের মতোই চলছে।’ স্পিকার বলেছেন, ‘সরকারি অধিকাংশ কর্মকর্তাই চোর।’ রাষ্ট্রের দুই শীর্ষ সাংবিধানিক অভিভাবকের মুখ থেকে এই অকাট্য মন্তব্যের পর আর কারও কিছু বলার থাকে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি অনেক ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। ব্যক্তিনির্ভর ব্যবস্থা যত দিন থাকবে, তত দিন ঘুষের সুযোগও থাকবে। তাঁদের মতে মাঝে মাঝে দুদকের অভিযানে কিছু কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ধরা পড়লেও ঘুষ-দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। রাষ্ট্রপতি ও স্পিকারের মুখে তারই প্রতিধ্বনি শোনা গেল।

তিনটি খ চিত্র : ১৮ সেপ্টেম্বর শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে ঘুষ লেনদেনের একটি ভিডিও সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এ ভিডিওতে নিরাপত্তাকর্মী, পিয়ন এমনকি রেজিস্ট্রারকেও প্রকাশ্যে ঘুষ নিতে দেখা যায়।

১৬ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে ১ হাজার ১৫০ টাকা সরকারি খরচের একটি নামজারির জন্য ৭০ হাজার টাকা দাবি করার অভিযোগ ওঠে এক তহশিলদারের বিরুদ্ধে। এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

একই দিনে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা খবিরুল আলমের ঘুষ নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, নতুন ভোটার হওয়ার কাজ করে দেওয়ার জন্য তিনি ৫ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে ২ হাজার টাকা দেওয়ার দৃশ্য ভিডিও করেন সেবাপ্রার্থী।

শুধু উল্লিখিত তিনটি ঘটনাই নয়, সরকারি অফিস বিশেষ করে সেবা সংস্থাগুলোয় এ চিত্র নিত্যদিনের; যা ‘বৈধ’ বা ‘স্বাভাবিক’ বিষয় হিসেবে সবাই মেনে নিয়েছে।

ঘুষ.সাইটের চিত্র : নাগরিকের ঘুষের অভিজ্ঞতা প্রকাশের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘ঘুষ.সাইট’-এ জমা হওয়া অভিযোগগুলো সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। ওয়েবসাইটটির তথ্যানুযায়ী, প্রতিষ্ঠার পর থেকে গতকাল পর্যন্ত ৩৩ দিনে ১৯ হাজার ১২৮টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগে দাবীকৃত ঘুষের পরিমাণ ৫৫২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। তথ্যানুযায়ী, আট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘুষ দাবি করা হয়েছে ঢাকা বিভাগে। সর্বোচ্চ ঘুষ চাওয়ার পরিমাণ ১০ কোটি টাকা এবং গড় ঘুষ চাওয়ার পরিমাণ ২ লাখ ৮৯ হাজার টাকা। তথ্যানুযায়ী, ঢাকা বিভাগে এক মাসে ৭ হাজার ৫০১, চট্টগ্রামে ৪ হাজার ৭০, রাজশাহীতে ১ হাজার ৬৫১, খুলনায় ১ হাজার ৫০৩, রংপুরে ১ হাজার ৩৪৩, ময়মনসিংহে ১ হাজার ২০৮, বরিশালে ৯৯৪ এবং সিলেট বিভাগে ৮৫৮টি অভিযোগ জমা পড়েছে ঘুষ.সাইটে।

টিআইবির জরিপের ফল : ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘সেবা খাতে দুর্নীতি : জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক জরিপের ফলাফলে ঘুষের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। টিআইবির তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে প্রাক্কলিত মোট ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। এ অর্থ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত জাতীয় বাজেটের ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ ও জিডিপির শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ। গত জুনে টিআইবি এ জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে। দেশের আট বিভাগের গ্রাম ও শহর এলাকার ১৫ হাজার ৭১৫ পরিবারের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দুই ধাপের স্তরায়িত গুচ্ছ নমুনা পদ্ধতিতে এ জরিপ করেছে টিআইবি।

পেনশনের টাকা পেতে ঘুষ দিয়ে ঘুষের সাইট : সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, সরকারি প্রাপ্য অর্থ তুলতেও ঘুষের অভিযোগ উঠছে। ময়মনসিংহের একটি পরিবারের এক সদস্যের মৃত্যুর পর তাঁর প্রভিডেন্ট ফান্ডের প্রায় ৭ লাখ টাকা তুলতে ট্রেজারি অফিস, জেলা শিক্ষা অফিস এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে মোট ৩৮ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। পরিবারটির অভিযোগ, পরে কল্যাণ তহবিলের ২ লাখ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্য আরও ৮ লাখ টাকা তুলতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কার্যালয়ের ব্যক্তিরা ১ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। টাকা না দিলে ফাইল এগোবে না বলেও জানানো হয় বলে অভিযোগ পরিবারের। এসব অভিজ্ঞতা থেকেই ১৭ বছর বয়সি শাহেদ শরীফ আহমেদ ‘ঘুষ.সাইট’ নামে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেন। এ ওয়েবসাইটে এখন নানা ধরনের ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরছে সাধারণ মানুষ।

সময়ে সময়ে বদলে যায় ঘুষ নেওয়ার কৌশল : দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, ডিজিটাল সেবা ও নজরদারি বাড়লেও ঘুষ নেওয়ার কৌশলও সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে। আগে সরাসরি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর হাতে টাকা দেওয়ার অভিযোগ বেশি থাকলেও এখন অনেক ক্ষেত্রে দালাল, মধ্যস্থতাকারী, মোবাইল ব্যাংকিং, আত্মীয়স্বজনের অ্যাকাউন্ট কিংবা বিভিন্ন ‘সার্ভিস চার্জ’-এর আড়ালে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ উঠছে। কোথাও ফাইল আটকে রেখে, কোথাও অযথা কাগজপত্রের ঘাটতি দেখিয়ে, আবার কোথাও সেবা প্রদানে বিলম্ব ঘটিয়ে ঘুষ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে সেবাপ্রার্থীদের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরাসরি লেনদেনের ঝুঁকি এড়াতে দুর্নীতিবাজ চক্রগুলো নতুন নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করছে। ফলে ঘুষের ধরন পরিবর্তিত হলেও মূল সমস্যা একই রয়ে গেছে।

বড় চেয়ারের কর্মকর্তাকে সৎ ও সাহসী হতে হবে : জানতে চাইলে সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সচিব ও সংস্থাপ্রধানদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের মানসিকতা থাকতে হবে। এ পদে সৎ ও সাহসী কর্মকর্তা নিয়োগ দিলে ঘুষগ্রহণের প্রবণতা ভয়ে অর্ধেক কমে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘কিছু কাজ করতে হবে দৃশ্যমান, যেমন ঘুষ নেওয়া কিছু কর্মকর্তাকে বড় শাস্তি দিতে হবে। এখন এ শাস্তি দিতে হলে বড় চেয়ারের কর্মকর্তাকেও সৎ ও সাহসী হতে হবে।’

দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন : দুদকের প্যানেল আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট শাহীন আহমেদ বলেন, ‘দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু দুদকের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; এর জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে “জিরো টলারেন্স” বার্তা এবং দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। এতে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম আরও কার্যকর হতে পারে।’ সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। দুর্নীতি দমন করতে হলে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, জবাবদিহি ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’

শাহীন আহমেদ আরও বলেন, ‘দুদকের ক্ষমতা ও দায়িত্ব আইন দ্বারা নির্ধারিত। দুদকের কাজ হলো অভিযোগের অনুসন্ধান ও তদন্ত করে প্রমাণ সংগ্রহ এবং তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করা। কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা দুদকের নেই। তদন্ত শেষে মামলা আদালতে গেলে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতই দোষী বা নির্দোষ নির্ধারণ করেন। এ ক্ষেত্রে দুদকের প্রসিকিউশন টিম আদালতে সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করে। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া, যেখানে দুদক, প্রসিকিউশন, বিচার বিভাগ-সব পক্ষের ভূমিকা রয়েছে।’

ঘুষ ও অবৈধ লেনদেনের নিয়ন্ত্রণকারীরাও ভাগ পান কি না, সে প্রশ্নও আসে : টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার ওপর ঘুষ ও অবৈধ লেনদেন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব রয়েছে, তারা কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। এমনকি অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে-নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাও কোনোভাবে এর ভাগ পান কি না?’

সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘ঘুষ ও অবৈধ লেনদেন বন্ধ না হওয়ার অন্যতম কারণ শাস্তির অভাব। কোনো অপরাধের বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে তা ধীরে ধীরে সমাজে স্বাভাবিক চর্চায় পরিণত হয়। সমাজমাধ্যম, গণমাধ্যম এবং সম্প্রতি চালু হওয়া ঘুষ.সাইটে প্রকাশিত তথ্যও দেখাচ্ছে, ঘুষ এখন উদ্বেগজনকভাবে বিস্তার লাভ করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘টিআইবির জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫ অনুযায়ী, ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়া ৮৫ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, ঘুষ না দিলে তাঁরা প্রয়োজনীয় সেবা পেতেন না। অর্থাৎ মানুষকে কার্যত জিম্মি করে ঘুষ আদায় করা হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর এর বোঝা সবচেয়ে বেশি পড়ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে এবং ঘুষ যেন সেবা পাওয়ার অনিবার্য শর্তে পরিণত হয়েছে।’

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জনবল, দক্ষতা ও নানান সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। তবে অতীতে ফাঁদ মামলার মতো কার্যক্রমের মাধ্যমে কিছু ইতিবাচক প্রভাব তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে সে ধরনের কার্যক্রম খুব একটা দেখা যায় না। পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকেও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নজির খুব কম। ফলে দুর্নীতিবাজদের মধ্যে শাস্তির ভয় কমে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘শুধু বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করলেই দুর্নীতি কমবে-এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বরং যারা ঘুষ গ্রহণে অভ্যস্ত, তারা অনেক সময় বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ঘুষের পরিমাণও বাড়িয়ে দিতে পারে। এ কারণে টিআইবি প্রস্তাব করেছিল, সরকারি কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী নিয়মিত ও প্রকাশ্যভাবে দাখিল করাকে বাধ্যতামূলক করা হোক এবং বর্ধিত বেতন-ভাতা পাওয়ার সঙ্গে এ শর্ত যুক্ত করা হোক।’ তাঁর মতে সম্পদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর ভূুমিকা রাখা সম্ভব। তবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের যেসব সুযোগ ও উপায় রয়েছে, সেগুলোর অনেকটিই এখনো যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights