‘প্রতারক’ থেকে ‘মহান বন্ধু’, চীন নিয়ে যেভাবে সুর বদলালেন ট্রাম্প

অনলাইন ডেস্ক

একসময় চীনকে ‘প্রতারক’ ও ‘শত্রু’ বলে কড়া ভাষায় আক্রমণ করতেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই ট্রাম্পের মুখেই এখন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রশংসা—‘মহান ভদ্রলোক’, ‘খুব ভালো বাণিজ্যিক অংশীদার’ এমনকি ‘সত্যিকারের মহান বন্ধু’। শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফর ঘিরে ট্রাম্পের এই বদলে যাওয়া সুর নতুন করে আলোচনায় এনেছে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন ও বাণিজ্যিক সমীকরণকে।

গত বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) শি জিনপিং ওয়াশিংটনে পৌঁছালে ট্রাম্প নিজেই জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে গিয়ে তাকে স্বাগত জানান। ১৯৬২ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড ম্যাকমিলানকে স্বাগত জানানোর পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের এভাবেই বিদেশি কোনো নেতাকে অভ্যর্থনা জানানোর ঘটনা এটিই প্রথম। ওয়াশিংটনে শি জিনপিংকে ঘিরে ব্যাপক আনুষ্ঠানিকতা, জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন এবং প্রশংসাসূচক বক্তব্য দেন ট্রাম্প। অথচ অতীতে চীন ও এই শি জিনপিংকে নিয়েই ট্রাম্পের বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

একসময় চীনকে ‘প্রতারক’ বলেছিলেন ট্রাম্প

২০১২ সালের আগস্টে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প চীনকে অলিম্পিকে প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। তিনি চীনকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘মিথ্যা বলা, প্রতারণা ও চুরি’র সঙ্গে যুক্ত করেন।

২০১৫ সালে নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প বলেছিলেন, চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে বাণিজ্যিকভাবে প্রতিযোগিতা করতে হলে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এগোতে হবে। একইসঙ্গে তিনি চীনা নেতাদের রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ দেওয়ার সমালোচনা করে বলেছিলেন, তাদের সঙ্গে নৈশভোজ না করে আলোচনার টেবিলে ফিরে যাওয়া উচিত।

একই বছর প্রকাশিত নিজের বই ‘ক্রিপল্ড আমেরিকা: হাউ টু মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’-এ ট্রাম্প চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘শত্রু’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার অভিযোগ ছিল, কম মজুরির শ্রমিক ব্যবহার করে চীন বিভিন্ন মার্কিন শিল্প ধ্বংস করেছে, হাজার হাজার কর্মসংস্থান নষ্ট করেছে, মার্কিন ব্যবসায় গুপ্তচরবৃত্তি করেছে, প্রযুক্তি চুরি করেছে এবং মুদ্রার মূল্য নিয়ন্ত্রণ করেছে।

২০১৬ সালে ইন্ডিয়ানায় এক নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘লুটে নেয়ার’ অভিযোগ তোলেন। ২০২০ সালে তিনি আরও বলেন, চীন যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তেমনটি আর কোনো দেশ করেনি।

দ্বিতীয় মেয়াদে বদলে যায় সুর

২০২৫ সালের এপ্রিলেও যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ তীব্র হওয়ার সময় ট্রাম্প চীন ও শি জিনপিংকে সরাসরি দায়ী না করে বলেন, তিনি চীনকে দোষ দেন না এবং শি জিনপিংকে তিনি পছন্দ করেন। এরপর চলতি সপ্তাহে শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় ট্রাম্পের বক্তব্যে আরও উষ্ণতা দেখা যায়। তিনি শিকে ‘মহান ভদ্রলোক’, চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে ‘খুব ভালো বাণিজ্যিক সম্পর্ক’ এবং দুই দেশের সম্পর্ককে ‘সত্যিকারের মহান বন্ধুত্ব’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

শি জিনপিংয়ের এবারের সফর ১১ বছরের মধ্যে কোনো চীনা নেতার প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর। একই সঙ্গে এক বছরেরও কম সময়ে ট্রাম্প ও শির তৃতীয় মুখোমুখি বৈঠক এটি। তবে দুই দেশের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বিরল খনিজ, তাইওয়ান এবং ইরান যুদ্ধসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রতিযোগিতা ও মতবিরোধ এখনো রয়েছে। এর পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধও পুরোপুরি শেষ হয়নি।

বাণিজ্যযুদ্ধের চাপ

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্র। চীন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা শুল্ক আরোপের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজের রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে। একপর্যায়ে দুই দেশই একে অপরের পণ্যের ওপর প্রায় ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের পথে এগিয়েছিল। পরে আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে তা স্থগিত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতিও কমেনি। ২০২৫ সালের মে থেকে জুলাই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ২৭৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের একই সময়ে তা বেড়ে প্রায় ৩২৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়—যা ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালে চীনের মোট পণ্য রপ্তানি ৬ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৩ দশমিক ৭৭ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত চীনের পণ্য বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ৮২০ বিলিয়ন ডলার।

বিরল খনিজে চীনের প্রভাব

বিরল খনিজও চীনের বড় শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। এসব খনিজ স্মার্টফোন থেকে শুরু করে যুদ্ধবিমান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের পরিচিত বিরল খনিজের প্রায় ৬০ শতাংশের মজুত চীনে এবং এগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত করে দেশটি। গত বছরের বাণিজ্যযুদ্ধের সময় চীন ১২ ধরনের বিরল খনিজের মধ্যে সাতটির রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে। আরও পাঁচটির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।

শি-ট্রাম্প বৈঠকে কী হলো?

শি জিনপিং ও ট্রাম্পের বৈঠকে বড় কোনো সমঝোতা না হলেও দুই দেশ বিদ্যমান বাণিজ্যবিরতি আরও কিছু সময়ের জন্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে বৃহত্তর চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য দুই দেশের প্রতিনিধিরা আরও সময় পেলেন। নতুন বাণিজ্যবিরতি আগামী ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। তবে ইরান ইস্যুতে বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি। ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে চীনের প্রভাব কাজে লাগানোর প্রত্যাশা ছিল ট্রাম্পের।

তাইওয়ান ইস্যুতেও মতপার্থক্য রয়ে গেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, শি জিনপিং ট্রাম্পকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার এবং বিষয়টি ‘সতর্কতার সঙ্গে’ মোকাবিলার আহ্বান জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, দুই নেতা দুই দেশের সম্পর্কের আরও অবনতি ঠেকানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন। শি প্রতিযোগিতাকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখার আহ্বান জানান এবং পরাশক্তির সংঘাতের সম্ভাবনা বোঝাতে ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’-এর প্রসঙ্গ তোলেন। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য একটি ‘নোটিফিকেশন মেকানিজম’ বা যোগাযোগব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights