অভিঘাত ঠেকাতে দুই পদক্ষেপ
মানিক মুনতাসির
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বাংলাদেশের ক্ষতি বাড়লেও বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে দেশের দায় শূন্য দশমিক ৪৭ শতাংশেরও কম। জলবায়ু ঝুঁকির বিপরীতে এই বৈষম্যকে সামনে রেখে এবার ঘর ও আন্তর্জাতিক-দুই দিকেই বড় প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। দেশের জলবায়ু অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে সংশোধন করা হচ্ছে ২০১০ সালের জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট আইন। পাশাপাশি নভেম্বরে তুরস্কে অনুষ্ঠেয় কপ-৩১-এ অভিযোজনের জন্য অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন, জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসানের অর্থ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি হস্তান্তরের দাবিতে শক্ত অবস্থান নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছর জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ৫ থেকে ২ শতাংশ ক্ষতির মুখে পড়ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতি জিডিপির ৯ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। একই সময়ের মধ্যে তাপমাত্রা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে দেশের প্রায় ১৭ শতাংশ ভূখণ্ড তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে কৃষি, খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিও বাড়ছে।
নিজস্ব তহবিলেও উদ্যোগ : জলবায়ু ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তার পাশাপাশি নিজস্ব অর্থায়নেও এগিয়েছে বাংলাদেশ। ২০০৯ সালে গঠিত বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডে (বিসিসিটিএফ) নিজস্ব রাজস্ব থেকে এ পর্যন্ত ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ২০২৩-২০৫০ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য নেওয়া জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় (এনএপি) ১১৩টি অগ্রাধিকার কর্মসূচির জন্য প্রয়োজন প্রায় ২৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর বড় অংশ আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশোধন হচ্ছে ট্রাস্ট আইন : জলবায়ু অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে ‘জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট (সংশোধিত) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আইনটি সংশোধনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতামত নেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যালোচনা সভাও হয়েছে।
এর আগে ১ সেপ্টেম্বর ২৫ সদস্যের জাতীয় জলবায়ু অর্থায়ন কমিটি গঠন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী এ কমিটির সভাপতি, পরিবেশমন্ত্রী সহসভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. সাইমুম পারভেজ সমন্বয়কের দায়িত্বে রয়েছেন। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অর্থায়ন, কার্বন ক্রেডিট ও কার্বন বাণিজ্যকে সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা এ কমিটির অন্যতম লক্ষ্য।
কপ-৩১-এ বাংলাদেশের দাবি : আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় কপ-৩১ অনুষ্ঠিত হবে। সম্মেলন সামনে রেখে ১৭ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা এবং ২৩ সেপ্টেম্বর কপ-৩১ কারিগরি সমন্বয় কমিটির দ্বিতীয় সভা হয়েছে। সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধান দাবির মধ্যে থাকবে ঋণের পরিবর্তে অনুদানভিত্তিক ও সহজ শর্তে অভিযোজন অর্থায়ন, ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসানের আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে দ্রুত অর্থ ছাড়, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং এনডিসি-৩.০ বাস্তবায়নে কারিগরি সহায়তা বাড়ানো। বাংলাদেশের প্যাভিলিয়নে জলবায়ু ঝুঁকি, স্থানীয় নেতৃত্বাধীন অভিযোজন, নারী ও শিশুদের ঝুঁকি এবং স্থানীয় অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হবে। ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ কপ-২০২৬’-এর মাধ্যমে ৬৪ জেলার তরুণদের মতামতে তৈরি জাতীয় যুব জলবায়ু অবস্থানপত্রও উপস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অর্থায়নের দাবি তোলার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে জলবায়ু তহবিল ব্যবহারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক প্রভাব, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প ও অপচয় বন্ধ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি অর্থ ব্যবহারে কার্যকর নজরদারি ও জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে।
