নজরদারিতে অর্থদাতারা
ইমরান রহমান
দেশকে আবার অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে গণ অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ। ভারতে পালানো শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পরই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা নতুন করে অপতৎপরতা শুরু করেন। এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি রাজধানীর কূটনৈতিক জোন গুলশানে মিছিল বের করে নতুন কর্মসূচির নামে নাশকতায় অর্থ বিনিয়োগ করতে থাকেন। দেশে ঘাপটি মেরে থাকা কর্মীদের দিয়ে পুলিশি কঠোর নজরদারির মধ্যেই অন্তত ১২ স্পটে ৩২টি ককটেল বিস্ফোরণ ও কয়েকটি বাসে অগ্নিসংযোগ ঘটান। এসব ঘটনার কয়েকটিতে জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ জানতে পারে ককটেল ও অগ্নিসংযোগে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা লেনদেন হচ্ছে। লোকেশন ও টার্গেট নির্ধারণ করে বেশির ভাগ হুকুম বিদেশি নম্বর থেকে এলেও সমন্বয় করছে দেশের কিছু ব্যক্তি। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব অপতৎপরতা মূলত রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কৌশল। আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থদাতারা নজরদারির মধ্যে রয়েছে।
এদিকে নাশকতা ঠেকাতে অর্থদাতা ও সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ইতোমধ্যে বেশ কিছু নাম পাঠানো হয়েছে ডিবির বিভিন্ন বিভাগে। নিরাপত্তা নিশ্চিতের স্বার্থে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ওই ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের সময় লুটপাট ও দুর্নীতি করে অঢেল সম্পদের মালিক যারা হয়েছেন তারাই বিদেশে বসে দেশকে অস্থিতিশীল বানানোর চেষ্টা করছেন। এই কাজের নেতৃত্ব দিচ্ছে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পলাতক নিষিদ্ধ দলটির শীর্ষ নেতারা। এ ছাড়াও আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক নেতা এখনো ঢাকাতেই ঘাপটি মেরে আছেন। তারা আত্মগোপন থাকা অবস্থাতেই নিজেদের বিশ্বস্ত কর্মীদের দিয়ে নাশকতামূলক কাজ পরিচালনা করছেন।
নতুন করে নাশকতা ঘটাতে ঢাকার বাইরের অন্য মহানগর ও থানা পর্যায়ের নেতাদের কাজে লাগানো হতে পারে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যারা ককটেল বা অগ্নিসংযোগের পর সহজেই পলাতক থাকতে পারে। এজন্য এখনো পলাতক আওয়ামী লীগের এমপি ও ঢাকার আশপাশের শীর্ষ নেতাদের নাম রাখা হয়েছে অর্থদাতা ও নাশকতার নেতৃত্বদানকারীর তালিকায়।
সূত্র বলছে, চলতি মাসের ১৮, ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে ককটেল ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগ। সুপ্রিম কোর্টের ফটকের সামনে, শিল্পকলা একাডেমি, যাত্রাবাড়ী থানার সামনে, মালিবাগ, আগারগাঁও, মহাখালী, নিউমার্কেট, বাবুবাজার, কমলাপুর স্টেশন, মগবাজার, মৎস্য ভবন মোড় ও রামপুরায় বিটিভি ভবনের সামনে ককটেল বিস্ফোরিত হয়। এ ছাড়াও কাফরুল থানার সামনে, মিরপুর-১১, মিরপুর-১, মধ্য বাড্ডা, পল্লবী ও আজিমপুরে ছয়টি বাসে আগুনের ঘটনা ঘটে ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করা হয়। কমলাপুর রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রেনে করা হয় অগ্নিসংযোগ। কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি, ৩ শতাধিক চেকপোস্ট, পেট্রোলিংসহ সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের পরেও এসব হামলা ঠেকাতে না পারায় নতুন পরিকল্পনা হাতে নেয় পুলিশ। হামলায় জড়িতদের আইনের আওতায় এনে অর্থদাতাদের গ্রেপ্তারে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে অর্থদাতাদের নতুন তালিকা তৈরি শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে গ্রেপ্তারদের ডিভাইস ফরেনসিক করে মিলেছে বেশ কয়েকজন অর্থদাতার নাম। ডিবির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, প্রতিটি বিভাগেই ১০-১২ জন অর্থদাতার নামের তালিকা দেওয়া হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ তালিকা সম্পন্ন হলে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। প্রাথমিক তালিকা ধরে সংশ্লিষ্ট টিম অভিযান পরিচালনা অব্যাহত রেখেছেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগের পতনের পর দলের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূলের কর্মীরা আত্মগোপনে চলে গেলেও তাদের যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়নি। আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মী ঢাকার অপরাধপ্রবণ এলাকা ও অন্যান্য বিভাগীয় শহরে আশ্রয় নিয়েছেন। এ ছাড়া ছদ্মবেশে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় আত্মগোপন করে রাজনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখছেন। তারা টেলিগ্রাম, ফেসবুক ও বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে শেখ হাসিনার বার্তা ছড়িয়ে নেতা-কর্মীদের চাঙা রাখার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি ডিসেম্বরকে টার্গেট করে নেতা-কর্মীদের সক্রিয় রাখার চেষ্টা চলছে।
গোয়েন্দা নজরদারিতে যেসব নেতা
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ঢাকায় ঘাপটি মেরে থাকা আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতারা বিদেশে পলাতক ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, নসরুল হামিদ বিপু, জাহাঙ্গীর আলম (গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র), নিক্সন চৌধুরী, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের সঙ্গে যোগাযোগ করছে বেশি। তারাই ককটেল ও অগ্নিসংযোগের নির্দেশ দিচ্ছেন। মহানগরের নেতা, সাবেক এমপি ও সাবেক কাউন্সিলররা হামলাকারীদের সঙ্গে সমন্বয় করছেন। বিদেশ থেকে নির্দেশ এলেও অর্থের জোগান দিচ্ছেন দেশে ঘাপটি মেরে থাকা এই সমন্বয়ক নেতারাই। অর্থের সঙ্গে হামলাকারীদের দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন কমিটিতে প্রত্যাশিত পদ পাওয়ার প্রতিশ্রুতি। আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনে ও নাশকতার সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা এমন অর্ধশত নেতা গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
ভিডিও পাঠালেই মিলছে প্রতিশ্রুত টাকা
গত ১৮ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী থানার সামনে পাঁচটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় একটি মোটরসাইকেলসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। এই হামলার নেতৃত্ব দেন বংশাল থানাধীন ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ৬ নম্বর ইউনিটের দপ্তর সম্পাদক মো. রায়হান উদ্দিন। পাঁচ মাস জেল খেটে বেরিয়ে প্রতি ককটেল ৫ হাজার টাকার চুক্তিতে সহযোগিদের নিয়ে পাঁচটি বিস্ফোরণ ঘটান। একটি ভারতীয় নম্বর থেকে তার রাজনৈতিক গুরু ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. সাব্বির হোসেন ককটেল মারার নির্দেশ দেয়।
ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুন দেওয়ার সমন্বয় করার অভিযোগে ২১ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার থেকে সবুজ নামে এক আওয়ামী লীগ নেতাকে গ্রেপ্তার করে ডেমরা থানা পুলিশ। ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে কমলাপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় গ্রেপ্তার হয় দুজন। ২০ সেপ্টেম্বর আজিমপুরে পার্কিং করা একটি বাসে অগ্নিসংযোগের চেষ্টাকালে আমিনুল ইসলাম শাওন নামে এক যুবলীগকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল ভোরে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে অভিযান চালিয়ে বিস্ফোরক দ্রব্য ও ককটেল তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং অসৎ উদ্দেশ্যে তৈরি করা ৯ হাজার পিস কাগজের মুখোশ উদ্ধারসহ এক দুষ্কৃতকারীকে গ্রেপ্তার করেছে শ্যামপুর মডেল থানা পুলিশ। এই তিন ঘটনাতেই গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদ ও ডিভাইস ফরেনসিক করে পুলিশ জানতে পারে অর্থদাতাদের নাম।
১৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলে করে গিয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের সামনে ককটেল বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় সিসি ক্যামেরা ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ২০ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে সালমান ইসলাম সাকিব ওরফে আসিফ (২৩) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের মতিঝিল থানা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসিফ ডিবি পুলিশকে জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্ট গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হওয়ায় তাকে ১০ হাজার টাকা দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। সময় ও লোকেশন জানিয়েছে একটি বিদেশি নম্বর থেকে। তাকে নির্দেশনা দেয় মতিঝিল থানা ছাত্রলীগের সভাপতি মিরাজ বিশ্বাস। পট পরিবর্তনের পর মিরাজ বিশ্বাস বিদেশে পালিয়ে যান বলে জানা গেছে।
গত মঙ্গলবার গুলশানের একটি বাসা থেকে চট্টগ্রাম-৩ আসনের এমপি মো. মাহফুজুর রহমান মিতাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। তিনি আত্মগোপনে থাকা অবস্থাতেই আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন ও নাশকতায় অর্থদাতা হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, সংগঠিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় দেশে নাশকতা করতে বিদেশে বসে নেতৃত্ব দিচ্ছে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান দুই ডজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতা। যারা সমাজমাধ্যম ফেসবুকেও বেশ সরব রয়েছেন। বিভিন্নভাবে গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করছেন।
নাশকতার ঘটনা আরও ঘটার আশঙ্কা
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার কথাটি মূলত রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং নেতা-কর্মীদের চাঙা রাখার একটি কৌশল। এর পরও নাশকতার ঘটনা আরও ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সতর্ক থাকতে হবে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সম্প্রতি নাশকতার ঘটনায় যারা গ্রেপ্তার হচ্ছে তাদের কাছ থেকে অর্থদাতাদের কিছু নাম আমরা পেয়েছি। তাদের গ্রেপ্তারে আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত আছে। এ ছাড়াও যাদের বিরুদ্ধে অর্থদাতা হিসেবে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে তাদেরই আইনের আওতায় আনা হবে।
