দেরিতে ডেঙ্গু পরীক্ষা করায় বাড়ছে ঝুঁকি
জয়শ্রী ভাদুড়ী
রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মাজার রোড এলাকা থেকে ভর্তি হয়েছেন হাসনাহেনা বেগম (৪৫)। তাঁর স্বামী আফজাল হোসেন বলেন, ‘তিন দিন আগে জ্বর আসে। জ্বর এসে আবার ছেড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ তীব্র পেটব্যথা ও বমি শুরু হলে হাসপাতালে ভর্তি করাই। চিকিৎসক দেখে টেস্ট করাতে বললে ডেঙ্গু পজিটিভ আসে। চিকিৎসকরা বলেছেন, চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হওয়ায় আমার স্ত্রীর কিছু শারীরিক জটিলতা দেখা দিয়েছে।’ দেশে ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। জ্বর ও অন্যান্য উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরও অনেক রোগী দেরিতে পরীক্ষা করাতে হাসপাতালে আসেন। এই দেরির জন্য জটিলতা নিয়ে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এরই মধ্যে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় ডেঙ্গুরোগীর চাপ বেশি। প্রতিদিনই নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে, বাড়ছে মৃত্যুও।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকালের ডেঙ্গুবিষয়ক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা) দেশে নতুন করে ৯৫৫ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে মারা গেছে দুজন। এ নিয়ে চলতি বছর দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭০ হাজার ১০৪ জন। মৃত্যু হয়েছে ২১১ জনের। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ৬৪ হাজার ৮২৭ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাসভিত্তিক হিসাবেও ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। বছরের প্রথম দিকে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও জুনের পর পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে। জুনে আক্রান্ত হয় ২ হাজার ৯০৭, জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬, আগস্টে ২২ হাজার ৫৩৬ ও সেপ্টেম্বরে ৩৪ হাজার ২৫৮ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ধারাবাহিক বেড়েছে। আগস্টে মৃত্যু ছিল ১১৪ এবং সেপ্টেম্বরে গতকাল পর্যন্ত ৪৩ জন মারা গেছে।
হাসপাতালে বাড়ছে চাপ : ঢাকার হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাসপাতালেও ডেঙ্গুরোগী ভর্তি হচ্ছে। হাসপাতালভিত্তিক প্রতিবেদনে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালগুলোয় গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩৭ এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় ৭২ জন নতুন রোগী ভর্তি হওয়ার তথ্য রয়েছে। সব মিলিয়ে এক দিনে নতুন ভর্তি ২০৯ জন। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৭। ঢাকা মেডিকেলে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৯ জন নতুন ডেঙ্গুরোগী ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে সেখানে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১৬৯। মুগদা মেডিকেলে নতুন ভর্তি হয়েছে ২০ জন এবং বর্তমানে ভর্তি আছে ১৫৬ জন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৫ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে এবং বর্তমানে ভর্তি রোগী ২৩১ জন। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নতুন ভর্তি ২৯ জন এবং বর্তমানে ভর্তি আছে ৮২ জন।
তরুণ ও কর্মক্ষম বেশি আক্রান্ত হচ্ছে : চলতি বছরের মোট আক্রান্তের বয়সভিত্তিক হিসাবেও তরুণ ও কর্মক্ষমদের আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি। ১৬-২০ বছরের ৯ হাজার ৫৫৮ জন, ২১-২৫ বছরের ১০ হাজার ১১৪ জন এবং ২৬-৩০ বছরের ১০ হাজার ২২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। এ ছাড়া ৩১-৩৫ বছরের আক্রান্ত হয়েছে ৬ হাজার ৯৩৫ জন। চলতি বছর আক্রান্তের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৪৩ হাজার ৬২২ ও নারী ২৬ হাজার ২৪১। অর্থাৎ মোট আক্রান্তের ৬২ দশমিক ৪ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ নারী। মৃত্যুর ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা বেশি। ২১১ মৃত্যুর মধ্যে নারী ১১২ ও পুরুষ ৯৮ জন।
এ ব্যাপারে জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘নারীরা রোগী হওয়া থেকে শুরু করে সকল পর্যায়ে অবহেলার শিকার হয়। যেভাবে চিকিৎসা পাওয়ার কথা, সেভাবে পায় না। এতে যেমন পরিবারের অবহেলা রয়েছে, তেমন তাদের নিজেদের অসচেতনতা ও অবহেলাও আছে। ২০২৩ সালেও এমন পরিস্থিতি হওয়ার পর এখনো সরকারের কাছে তথ্য নেই তারা কেন বেশি মারা গেল। এটা সরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা ও অবহেলা। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সচেতনতা তৈরিতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপই নিতে পারেনি।’ ঢাকার বাইরে ছড়াচ্ছে ডেঙ্গু : শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন বিভাগেও ডেঙ্গুরোগী বাড়ছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত রাজধানীর বাইরে ঢাকা বিভাগে ১২ হাজার ৬৯ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ১০ হাজার ২৮৭, খুলনায় ১১ হাজার ৪৭৬, রাজশাহীতে ৪ হাজার ৩৬৯, রংপুরে ২ হাজার ১১১, বরিশালে ৯ হাজার ৪১৯ ও সিলেটে ৩৭৫ জন রোগী শনাক্ত হওয়ার তথ্য রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বরকে সাধারণ ভাইরাস ধরে দীর্ঘ সময় বাড়িতে বসে না থেকে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার জন্য বলা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা এবং বিপজ্জনক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। একই সঙ্গে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং দিনের বেলায় মশার কামড় থেকে সুরক্ষার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
