৫৩ বছর পরও বাংলাদেশ শিখছে!

মনোয়ার হক

ক্রিকেট ছাড়া বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে সর্বত্র হযবরল অবস্থা। স্বাধীনতার পর থেকেই শুধু শিখছি আর শিখছি। ১৯৭৩ সালে মারদেকা কাপ দিয়ে ফুটবলে আন্তর্জাতিক অভিষেক বাংলাদেশের। ৫৩ বছর ধরে বিভিন্ন আসরে ম্যাচের সংখ্যা একেবারে কম নয়। কিন্তু সাফল্য বলতে সাফে কিছু শিরোপা ছাড়া আর কিছু নেই। সে ক্ষেত্রে দেরিতে খেলা শুরু করলেও মেয়েরাই বরং এগিয়ে আছেন। পুরুষ ফুটবলে দৈনদশা কাটছেই না। বিশ্বকাপে খেলবে তা এখন স্বপ্ন দেখাটাও স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। এশিয়া কাপ চূড়ান্ত পর্বে একবার খেললেও বাকিটা বাছাইপর্বে শেষ।

ফুটবলে বাংলাদেশের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে থাকার পরও কেন যে এ খেলা এগোচ্ছে না তা রহস্য থেকে যাচ্ছে। অনেকের ধারণা ছিল, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে বাংলাদেশের বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়রা খেলছেন তাদের জাতীয় দলে খেলার সুযোগ করে দেওয়া হলে হতাশার চিত্রটা পাল্টে যেতে পারে। সত্যি কথা বলতে কী অনেক দেশই এ পথ বেছে নেওয়ায় ফুটবলে অসম্ভব উন্নতি করেছে। বিশ্বকাপ খেলটা যাদের স্বপ্ন ছিল তারা প্রবাসী ফুটবলার অন্তর্ভুক্ত করে শুধু স্বপ্নই পূরণ করেনি, শক্তিশালী দেশগুলোর সঙ্গে সমানতালে লড়ছে।

স্বাধীনতাদেরিতে হলেও বাংলাদেশে প্রবাসী ফুটবলারের দেখা মিলেছে। জামাল ভূঁইয়া, তারিক কাজী বা কাজিম শাহরা আগে থেকেই জাতীয় দলে প্রবাসী ফুটবলার হিসেবে নাম লিখিয়েছেন। গেল এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে ইংলিশ লিগে খেলা হামজা দেওয়ান চৌধুরী, কানাডা প্রবাসী সামিত সোম, জায়ান আহমেদ ও ফাহমিদুল ইসলামদের অভিষেক হয়েছে। চূড়ান্ত পর্বে না উঠলেও এদের অন্তর্ভুক্তিতে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। ফুটবলে ফিরে এসেছে নতুন প্রাণ। আগে গ্যালারিশূন্য থাকলেও হামজা সামিতদের আগমনে গ্যালারি উপচে পড়ছে।

প্রবাসীদের দিয়ে যখন কাজ হচ্ছে তখন স্বাভাবিকভাবে বাফুফে নতুন প্রবাসীর সন্ধানে নামে, যা ইন্দোনেশিয়ায় দেখা যাচ্ছে। আসিয়ান কাপের মাধ্যমে ফিফার কোনো টুর্নামেন্টে প্রথমবারের মতো খেলছে বাংলাদেশ। শুরুতেই ৩-০ ব্যবধানে মালয়েশিয়ার কাছে হেরে আসরের যাত্রা করেছেন থমাস ডুলির শিষ্যরা। খেলায় জয়-পরাজয় থাকবেই। এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু মালয়েশিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ যে খেলাটা খেলেছে তা কি মানা যায়? হামজা, তারিক, জায়ান, ফাহমিদুল, ফারহান, সুকি ও জিদান ইউসুফ এ আট প্রবাসী মালয়েশিয়ার বিপক্ষে খেলেছেন। শুধু মাঠে নামেননি জামাল ভূঁইয়া। যদিও নতুন প্রবাসীদের মধ্যে ফারহান শুরু থেকে খেলেছেন। বাকি দুজন বদলি হিসেবে নামেন। যেটাই হোক এমন শক্তিশালী দল নিয়ে যা খেলল তাকে কি ফুটবল বলা যায়?

প্রবাসীর সংখ্যা বাড়া মানে স্থানীয়রা সাইড বেঞ্চে বসে থাকা। তাহলে লাভ হলো কি? হামজা, সামিত, জায়ান বা ফাহমিদুল যখন এশিয়ান কাপ বাছাইপর্ব খেলেছেন তখন তো দলের মধ্যে চমৎকার সমন্বয় দেখা গেছে। চূড়ান্ত পর্বে জায়গা হয়নি। তারপরও হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে প্রতি ম্যাচেই মনোমুগ্ধকর পারফরম্যান্স প্রদর্শন করেছে বাংলাদেশ। আসিয়ান কাপে উদ্বোধনী ম্যাচে আট প্রবাসী খেলায় মান তো আরও চোখে পড়ার মতো হবে এ আশা করা হয়েছিল। হামজা, ফারহান ও সুকি ছাড়া কেউ কি নজর কাড়তে পেরেছেন? ম্যাচে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করতে পারেনি। এ কেমন বাংলাদেশ দেখা গেল।

আসরে সিঙ্গাপুর ও স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে গ্রুপের দুই ম্যাচ বাকি রয়েছে। শুরুতে যে পারফরম্যান্স দেখাল তাতে কি ভালো কিছু আশা করা যায়? ১৯৭৩ সালে মারদেকা কাপ থেকে শুনছি, অল্প সময় প্রশিক্ষণে ফল ভালো হয় না। ৫৩ বছর পর এসেও নতুন কোচ থমাস ডুলি একই গান গাইছেন। বলেছেন, ‘হারের জন্য ছেলেদের দায়ী করব না। ওরা সাধ্যমতো খেলেছে। তা ছাড়া অনেক দিন খেলোয়াড়রা মাঠের বাইরে ছিল। অনুশীলনে পর্যাপ্ত সময়ও পায়নি। আসিয়ান কাপে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া অনেক শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। জয়-পরাজয় নয়, তাদের কাছে শিক্ষা নেওয়াটাই হবে বড় প্রাপ্তি, যা সামনে কাজে লাগবে।’

শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই, এটা চির সত্য কথা। তাই বলে ৫৩ বছরেও শেখার শেষ হবে না! ফুটবলে বাংলাদেশ কি কচিকাঁচার আসরে থাকবে! প্রশ্ন উঠেছে যে মানসম্পন্ন প্রবাসীরা আসছেন তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো, যোগ্য কোচ আনা হচ্ছে কি? মোটা অঙ্কের বেতন তো ঠিকই পকেটে তুলে নিচ্ছেন। ছাত্র ফাস্টবয় আর শিক্ষক যদি ফেল মার্কা হন তাহলে তো এমন হবেই। প্রবাসীদের নিয়ে বাফুফের অনেক ভাবনা। ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে ৬৮ দেশের খেলার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ নাকি এ সুযোগ কাজে লাগাতে চাচ্ছে। প্রয়োজনে জাতীয় দলে সব প্রবাসী খেলানো হবে। কেপভার্দে হতে চাচ্ছে বাংলাদেশ। তা কি সম্ভব। ভালো প্রবাসী আসবে কিন্তু সেই মানের কোচ যদি না হয় তহলে কি পরিকল্পনা কাজে লাগবে? নাকি বাংলাদেশ সাফেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights