ফাস্ট ফ্যাশনের মাশুল গুনছে প্রকৃতি

শামীম আহমেদ
ফ্যাশনের সঙ্গে তাল মেলাতে প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে পোশাক। আজকের ট্রেন্ড কালই পুরোনো। নতুন ডিজাইন, ব্র্যান্ড আর সামাজিক মর্যাদার প্রতিযোগিতায় প্রয়োজন ছাড়াই বাড়ছে পোশাক কেনার প্রবণতা। অথচ প্রতিটি নতুন পোশাক তৈরির পেছনে ব্যয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ পানি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি। ব্যবহৃত হচ্ছে নানা রাসায়নিক। উৎপাদন থেকে শুরু করে ব্যবহার শেষে ফেলে দেওয়া পর্যন্ত পোশাকের প্রতিটি ধাপেই তৈরি হচ্ছে পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ। ফ্যাশনের এই চাকচিক্যের আড়ালে তাই ক্রমেই গভীর হচ্ছে প্রকৃতির সংকট।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল ফ্যাশনের কারণে পোশাকের উৎপাদন ও বর্জ্য বাড়ছে। তুলা উৎপাদন, কাপড় তৈরি, রং করা, ওয়াশিং এবং পরিবহনে প্রচুর সম্পদ প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে ডেনিম পোশাক তৈরিতে পানির ব্যবহার উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালে ওয়াটার রিসোর্সেস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি সাময়িকীতে প্রকাশিত বাংলাদেশের একটি ডেনিম কারখানার গবেষণায় দেখা যায়, কারখানাটিতে প্রতিদিন ৭০ হাজার পোশাক তৈরি হতো। প্রতিটি পোশাকের গড় ওজন ছিল ৪০০ গ্রাম। অর্থাৎ দৈনিক উৎপাদন ছিল ২৮ হাজার কেজি ডেনিম পণ্য। প্রতি কেজি পণ্যে প্রায় ৭৩ লিটার পানি ব্যবহারের হিসাবে দৈনিক পানির প্রয়োজন হতো প্রায় ২০ লাখ ৪৪ হাজার লিটার।

একটি কারখানার এই হিসাবই পোশাকশিল্পে পানির বিপুল চাহিদার চিত্র তুলে ধরে। শিল্পকারখানায় ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার অব্যাহত থাকায় বিভিন্ন এলাকায় পানির স্তর নিচে নামছে। এতে পানীয় জলের সরবরাহ, কৃষি ও পরিবেশের ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেক এলাকায় গভীর নলকূপেও পানি উঠছে না। প্রতি বছর নলকূপের পাইপ আরও গভীরে পাঠাতে হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, গত ৫০ বছরে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অন্তত ২৩০ ফুট নিচে নেমেছে। তবে এই পতনের পেছনে শুধু পোশাকশিল্প নয়, ঢাকা শহরের বিপুল জনসংখ্যার পানির চাহিদা, নগরায়ণ এবং অন্যান্য শিল্পের ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনও দায়ী।

শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড এইচঅ্যান্ডএম এক গবেষণায় দেখতে পায়, এক জোড়া জিনস তৈরিতে ৭ হাজার লিটার পানি ব্যয় হয়-যা একজন ব্যক্তির সাত বছরের খাবার পানির চাহিদা মেটাতে পারে। এরপরই প্রতিষ্ঠানটি পানির অপচয় রোধে মনোনিবেশ করে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২০ সালে ১ কোটি ৮২ লাখ ১৯ হাজার ৪৮৬ ঘনমিটার পানি পুনর্র্ব্যবহার করে, যা ৭ হাজার ২৮৮টি অলিম্পিক সুইমিং পুলের পানির সমান। পানির সংকটের পাশাপাশি পোশাকশিল্পের বর্জ্যও পরিবেশের জন্য বড় উদ্বেগ। কাপড়ের রং ও প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত রাসায়নিক যথাযথভাবে শোধন না করে জলাশয়ে ফেললে পানি দূষিত হয়। অন্যদিকে পলিয়েস্টারের মতো কৃত্রিম তন্তুর পোশাক সহজে পচে না। ধোয়ার সময় এসব কাপড় থেকে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাও পানিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। অল্প ব্যবহারের পর পোশাক ফেলে দেওয়ার প্রবণতা বস্ত্রবর্জ্যরে চাপ বাড়ায়। এসব বর্জ্য যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না হলে মাটি ও পানিদূষণের ঝুঁকি তৈরি হয়।

গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ভোগবাদ আজ পৃথিবীর নীরব সংকট। ফ্যাশন ও গ্যাজেটসহ বিভিন্ন পণ্য ভোগের প্রতিযোগিতা বাড়ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশের ক্ষতি। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সচেতন ভোক্তা সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। ‘কম কিনুন, ভালো ব্যবহার করুন, পুনর্ব্যবহার করুন’-এই নীতিতে অভ্যস্ত হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষা, গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারণে টেকসই জীবনধারাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাঁর মতে, ভোগ কমানো মানেই পরিবেশ রক্ষায় অবদান রাখা। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন আন্দোলনের (পরিজা) সভাপতি এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আবদুস সোবহান বলেন, ভোগের প্রবণতা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের হাতে লাখ টাকার মোবাইল ফোন, পোশাকের ব্র্যান্ড ও নতুন পণ্য কেনা নিয়ে প্রতিযোগিতা চলছে। এতে পারিবারিক ব্যয়ের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কোম্পানিগুলো ভোক্তার মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে নতুন মডেল ও ফ্যাশন বাজারে আনে। বিজ্ঞাপন ও ফ্যাশন শোর মাধ্যমে সেগুলোকে অপরিহার্য করে তোলা হয়। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে সচেতনতার বিকল্প নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশের ক্ষতি কমাতে পোশাক কেনার অভ্যাসে পরিবর্তন জরুরি। যেকোনো পণ্যে সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া নতুন পোশাক না কেনা, একই পোশাক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরা, পুরোনো কাপড় মেরামত ও পুনর্ব্যবহার এবং দীর্ঘস্থায়ী পোশাক বেছে নেওয়া যেতে পারে। উৎপাদন পর্যায়ে পানি পুনর্ব্যবহার, বর্জ্য শোধন, জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহারও বাড়াতে হবে। ফ্যাশন মানুষের ব্যক্তিত্ব প্রকাশের মাধ্যম। কিন্তু তার মূল্য যদি হয় পানির সংকট, দূষণ ও পরিবেশের অবক্ষয়, তবে সেই সৌন্দর্যের স্থায়িত্ব থাকে না। তাই পোশাকের চাকচিক্যের পাশাপাশি তার পরিবেশগত মূল্য বিবেচনা করা জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights