এলডিসি উত্তরণকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অনুঘটক হিসেবে দেখতে হবে
নিজস্ব প্রতিবেদক
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণকে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারসুবিধা হারানোর বিষয় হিসেবে না দেখে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোগত পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়নের অনুঘটক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেছেন, উত্তরণের সুফল ধরে রাখতে হলে অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি এটিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদেরও এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে হবে। একইসঙ্গে রফতানি বহুমুখীকরণ, তৈরি পোশাক খাতের নতুন সম্ভাবনা কাজে লাগানো এবং সেবা খাতের বিকাশে গুরুত্ব দিতে হবে।
রবিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ : জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ও আমাদের পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য নতুন একটি কারিগরি বিষয় সামনে এসেছে। এলডিসি হিসেবে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে তিনটি প্রচলিত মানদণ্ডের বাইরে জনসংখ্যার একটি সীমাও রয়েছে। নতুন কোনো দেশকে এলডিসি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে হলে তার জনসংখ্যা ৭ কোটি ৫০ লাখের বেশি হওয়া যাবে না। ১৯৯১ সালে এই মানদণ্ড যুক্ত হয়েছে। পরে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোও তা অনুমোদন করেছে। ফলে এই শর্তের কারণে বাংলাদেশের পুনরায় এলডিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি বাংলাদেশের জানা প্রয়োজন।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এলডিসি উত্তরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটি দেশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। তবে এই উত্তরণকে বাংলাদেশের কাঠামোগত পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অনুঘটক হিসেবে দেখা উচিত। ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) মেয়াদ শেষ হবে। আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতিও স্পষ্ট হবে। তাই এখন থেকেই নিজেদের প্রস্তুতি ও করণীয় ঠিক করতে হবে।
তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণকে শুধু অতিরিক্ত তিন বছর বাজার সুবিধা পাওয়া, মেধাস্বত্বের বিধি-নিষেধে ছাড় কিংবা ওষুধ উৎপাদনে বিশেষ সুবিধা অব্যাহত রাখার বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। বরং ২০২৯ সালের পর কীভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতার শক্তি ধরে রাখা যায়, সেটিই মূল বিবেচনায় রাখতে হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি।
উত্তরণ প্রক্রিয়াকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, এখন পর্যন্ত আটটি দেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করেছে। এসব দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জনসংখ্যার দিক থেকে উত্তরণ করতে যাওয়া সবচেয়ে বড় এলডিসি। ফলে অন্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশের বাস্তবতা আলাদা। নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেদেরই বের করতে হবে। এই উত্তরণে বড় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একে শুধু ব্যবসায়ীদের সুবিধা-অসুবিধার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হতে হবে পুরো সমাজ ও অর্থনীতির অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া।
বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি হচ্ছে। এসব চুক্তির মাধ্যমে এলডিসি উত্তরণের পরও কিছু বাজারসুবিধা পাওয়া সম্ভব। তবে এর বাইরেও বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক মান ও শর্ত পূরণের বিষয় রয়েছে। কার্বন নিঃসরণ, শ্রমিকের অধিকার, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার, জেন্ডার অধিকার এবং পরিবেশগত মানদণ্ড এখন বৈশ্বিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এসব শর্ত পূরণের সঙ্গে এলডিসি উত্তরণের সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে বাংলাদেশকে এগুলো মেনে চলতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়েও আলোচনায় এসব শর্ত ও কমপ্লায়েন্সের বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে।
রফতানি বহুমুখীকরণ প্রসঙ্গে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তৈরি পোশাক খাতের বাইরে রফতানি বাড়ানোর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে তৈরি পোশাক খাতের মধ্যেও পণ্যের বৈচিত্র্য আনার বড় সুযোগ রয়েছে। বিশ্বে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইলের বাজার প্রায় ১ হাজার ২০০ বিলিয়ন ডলারের। এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। বিশেষ করে ম্যানমেইড ফাইবারভিত্তিক পোশাক উৎপাদন ও রফতানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিশ্ববাজারে এই ধরনের পোশাকের চাহিদা ও বাজারের অংশ বাড়ছে। তাই তৈরি পোশাক খাতের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, তৈরি পোশাকের বাইরে শ্রমঘন শিল্পের পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলিংয়ের মতো খাতেও বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে। একইসঙ্গে সেবা খাতের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ায় সিলভার ইকোনমি বা প্রবীণ জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক অর্থনীতির বিকাশ ঘটছে। পোশাক থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন পণ্যের বাজারে এর চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশও এই বাজারে প্রবেশের সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।
এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি বা মসৃণ উত্তরণ কৌশলে পাঁচটি স্তম্ভ, ৩০টি ক্ষেত্র এবং ১৫৭টি সুনির্দিষ্ট করণীয় চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ সময়সীমা নির্ধারণ করে বাস্তবায়ন করতে হবে। পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
