অধ্যক্ষকে উদ্ধারের পর চার দফা দাবি শিক্ষার্থীদের, পুলিশের বিরুদ্ধে লাঠিচার্জের অভিযোগ

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
রাজধানীর গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সায়েন্সের (সাবেক হোম ইকোনমিকস কলেজ) অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মেহেরুন্নেছাকে প্রায় ১৩ ঘণ্টা অবরুদ্ধ রাখার পর উদ্ধার করেছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টা থেকে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত তাঁকে নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় ছাত্রীদের ওপর পুরুষ পুলিশ সদস্যদের লাঠিচার্জ, চুল ও হিজাব ধরে টানাহেঁচড়া এবং মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে রাত সাড়ে ১২টার দিকে কলেজের সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে চার দফা দাবি ঘোষণা করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

দিনভর কলেজের প্রশাসনিক ভবনে অধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন ছাত্রীরা। এ সময় ‘দফা এক দাবি এক, প্রিন্সিপালের পদত্যাগ’ এবং ‘প্রিন্সিপালের কালো হাত, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন তাঁরা। অধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন রাতে পুলিশের হস্তক্ষেপের পর নতুন মাত্রা পায়।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও কলেজ প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, পূজার ছুটির আগে কলেজ অডিটোরিয়ামে তিনটি আবাসিক হলের পাঁচ বিভাগের মাস্টার্স শেষ বর্ষের (২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ) শিক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। রাত ১২টার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করার নির্দেশনা থাকলেও তা ভোর ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত চলে।

এ ঘটনায় অনুষ্ঠানের সমন্বয়কারী দুই শিক্ষার্থীর আবাসিক হলের আসন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মেহেরুন্নেছা। পরে তাঁদের কাছে এক রাতের অডিটোরিয়ামের এসি ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ ১২ হাজার ৬০০ টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে স্বেচ্ছাচারিতা ও অযৌক্তিক নিয়ম চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে এসব বিষয়ে কথা বলতে গেলে অধ্যক্ষ তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। এরপর তাঁরা অধ্যক্ষের কার্যালয়ে তালা দিয়ে অবস্থান নেন এবং তাঁর পদত্যাগের এক দফা দাবি জানান।

এ সময় শিক্ষার্থীরা অধ্যক্ষের সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদের কথা বলতে বাধা দেন এবং কার্যালয়ের তালা খুলতে অস্বীকৃতি জানান।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মেহেরুন্নেছা বলেন, ‘আমি এখনো রুমে আটকে আছি। আমার অভিভাবক মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক (ডিজি) মহোদয়কে বিষয়টি জানিয়েছি। সচিব স্যারও বিষয়টি জানেন। মাউশির ডিজি স্যার অন্যান্য কলেজের শিক্ষকদের নিয়ে আসছেন বলে আমাকে জানিয়েছেন।’

শিক্ষার্থীদের পদত্যাগের দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা কি এভাবে একজন অধ্যক্ষকে পদত্যাগ করাতে পারে? একজন অধ্যক্ষকে প্রশাসন পরিচালনা করতে গেলে অনেক ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আমি তো তাদের শাস্তি কমিয়ে দিয়েছি। তাদের বলেছি, ঠিক আছে, তোমরা বিদ্যুতের অপচয় করেছ। অন্তত বিদ্যুৎ বিলটা দাও। এ বিষয়ে আমি হোস্টেল সুপারকে বলেছিলাম, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের বক্তব্য জানতে। তারা আমার কাছে এসে কোনো দাবিও জানায়নি। তারা যদি বলত, ম্যাডাম, আমাদের বিষয়টি ক্ষমা করে দেন, আমরা বিল দিতে পারব না, তাহলে সেটি বিবেচনার সুযোগ ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন বাংলাদেশে একটা কালচার হয়ে গেছে, কোনো বিষয়ে উত্তেজিত হয়ে একটি প্রতিষ্ঠানে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করা। এটাকে প্রশ্রয় দিলে সামনে ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি হবে। একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য প্রশাসনকে বিভিন্ন ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। শিক্ষার্থীদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তাদের উত্তেজনার কারণে একটি প্রতিষ্ঠান অস্থিতিশীল হতে পারে না।’

শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারের অভিযোগ নাকচ করে অধ্যক্ষ বলেন, ‘আমি কাউকে বহিষ্কার করিনি। শিক্ষার্থীরা ভুল তথ্য দিচ্ছে। আমি হোস্টেল থেকে দুজনের সিট বাতিলের নোটিশ দিয়েছিলাম। কারণ, তারা হোস্টেলে থেকে শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছে। পরে তাদের সিট বহাল রেখেছি। শুধু বলেছি, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হবে।’

সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি কখনো এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। বিদ্যুৎ বিলের বিষয়টি নিয়ে বিভাগীয় প্রধানদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তাঁদের সঙ্গে কথা বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাঁরাও বলেছেন, শিক্ষার্থীদের ওপর কোনো না কোনো ব্যবস্থা আরোপ করতে হবে। তারা এখন কোনো কিছু শুনতে চায় না, শিক্ষকদেরও মানতে চায় না।’

অধ্যক্ষ আরও বলেন, ‘আমি কোনো অন্যায় করিনি। হয়তো একটু কঠোর হয়েছি। কিন্তু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হয়। গতকালও হোস্টেলের কয়েকজন ছাত্রী এসে আমাকে বলেছেন, আমি থাকায় তাঁদের জন্য ভালো হয়েছে এবং তাঁদের জন্য অনেক কিছু করেছি। এখন পরিস্থিতি কী হয়, তা দেখার অপেক্ষায় আছি। মাউশির ডিজি স্যারসহ অন্যান্য কলেজের শিক্ষকরা আসছেন। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখছি। আমি তো বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিইনি। এখন বিদ্যুৎ, খাবার ও পানি দেওয়া হচ্ছে। তবে এই পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে স্বাভাবিক থাকা কঠিন।’

কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক হাবিবা ইয়াছমিন বলেন, সকালে তিনি ও শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক অধ্যক্ষের কক্ষে বসে ছিলেন। এ সময় কয়েকজন ছাত্রী কথা বলার কথা বলে তাঁদের বাইরে ডেকে নিয়ে যান। পরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে অধ্যক্ষের কক্ষে তালা দিয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন।

তিনি জানান, কলেজে নির্মাণকাজ চলায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে অনুষ্ঠান রাত ১২টার মধ্যে শেষ করতে বলা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে দুই শিক্ষার্থীর আসন বাতিলের কথা বলা হলেও পরে তাঁদের আসন বাতিল না করার সিদ্ধান্ত হয়। অডিটোরিয়ামে ভোর পর্যন্ত এসি ও ফ্যান চলায় আসা বিদ্যুৎ বিল হোস্টেলের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাথাপিছু ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে সংগ্রহের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

উপাধ্যক্ষ আরও জানান, বিভাগীয় প্রধান ও শিক্ষকেরা কয়েক দফায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিলেও তাঁরা অধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে অনড় ছিলেন। বিষয়টি মাউশির মহাপরিচালক ও শিক্ষা সচিবকে জানানো হয়েছে।

মধ্যরাতে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ, চার দফা দাবি

রাত সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ অধ্যক্ষকে তাঁর কার্যালয় থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। এরপর রাত সাড়ে ১২টার দিকে কলেজের সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন আন্দোলনরত ছাত্রীরা।

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, অধ্যক্ষ পরিস্থিতি সমাধানের উদ্যোগ না নিয়ে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য ডেকে আনেন। পুলিশ অধ্যক্ষকে উদ্ধার করতে এলে পুরুষ পুলিশ সদস্যরা ছাত্রীদের ওপর লাঠিচার্জ করেন। এ সময় তাঁদের চুল ও হিজাব ধরে টানাহেঁচড়া করা হয় এবং কয়েকজনের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পুলিশের হামলায় কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলেও দাবি করেন তাঁরা।

এ ছাড়া দুজন শিক্ষার্থীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না জানিয়ে তাঁদের গ্রেফতার করা হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন আন্দোলনকারীরা।

সংবাদ সম্মেলন থেকে শিক্ষার্থীরা চার দফা দাবি ঘোষণা করেন। দাবিগুলো হলো—

১. শুক্রবার ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের সরকারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে দেওয়া হবে না।

২. মধ্যরাতে ছাত্রীদের গায়ে হাত তোলা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনার সুস্পষ্ট জবাব দিতে হবে এবং জড়িত পুলিশ সদস্যদের শোকজ করতে হবে।

৩. অধ্যক্ষ লিখিতভাবে কোনো ডকুমেন্ট না দেওয়া পর্যন্ত কলেজের সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।

৪. শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় মদদ দেওয়া ও ঘটনাটিকে বৈধতা দেওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights