আইসিসিবি হেরিটেজ রেস্টুরেন্টে জমকালো ‘গ্র্যান্ড মিউজিক্যাল নাইট’

অনলাইন ডেস্ক

ঢাকার রাত মানেই ব্যস্ততার ছুটে চলা, যানবাহনের হর্ন আর আলো-আঁধারির এক চেনা কোলাহল। ৩০০ ফিট সড়কের সেই ব্যস্ত রাতেই আইসিসিবিতে হেরিটেজ রেস্টুরেন্টের দরজা পেরোতেই যেন সময়ের গতি বদলে যায়।

বাইরে যখন শহর ছুটছে নিজের নিয়মে, ভেতরে তখন রবীন্দ্রসংগীতের মায়াবী সুরে দুলছে সন্ধ্যা। মৃদু আলোর আবেশ, মোগলাই খাবারের সুবাস আর কবিগুরুর গানের মূর্ছনায় তৈরি হয়েছে এক নান্দনিক পরিবেশ। মনে হয় যান্ত্রিক নগরীর বুকেই যেন গড়ে উঠেছে সুর, স্বাদ আর ঐতিহ্যের এক টুকরো প্রশান্তির দ্বীপ।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত রাজধানীর আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটি বসুন্ধরা (আইসিসিবি)-তে হেরিটেজ রেস্টুরেন্টে অনুষ্ঠিত হয় ‘গ্র্যান্ড মিউজিক্যাল নাইট’ এর বিশেষ আয়োজন।

এবারের পর্ব সাজানো হয়েছিল রবীন্দ্রসংগীত দিয়ে। কবিগুরুর কালজয়ী সুরের সঙ্গে ছিল ঐতিহ্যবাহী মোগল রন্ধনশৈলীতে তৈরি নানা পদের খাবার।

ফলে অতিথিদের জন্য এটি কেবল নৈশভোজ নয়, বরং সংগীত, স্বাদ ও ঐতিহ্যের এক সম্মিলিত অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।

অতিথিদের কেউ এসেছেন পরিবার নিয়ে, কেউবা বন্ধুদের সঙ্গে। টেবিলে সাজানো বাহারি খাবারের স্বাদ নেওয়ার পাশাপাশি তাদের মনোযোগ মঞ্চের দিকে। সেখানে চলছে সরাসরি সংগীত পরিবেশনা। কখনো গানের সুরে মগ্ন হচ্ছেন অতিথিরা, কখনো খাবারের ফাঁকে গুনগুন করে গলা মেলাচ্ছেন প্রিয় গানের সঙ্গে। খাবার আর সংগীতের এমন যুগলবন্দিতে সময়টুকু হয়ে উঠছে আরও উপভোগ্য।

রাত ৮টায় মঞ্চে আসেন রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী ছন্দা রায়। সংগীতের পাশাপাশি আবৃত্তিশিল্পী হিসেবেও পরিচিত তিনি। পরিবেশের সঙ্গে মিল রেখে শুরুতেই তার কণ্ঠে ভেসে আসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী গান ‘আগুনের পরশমণি’। গানের প্রতিটি সুর যেন মুহূর্তেই শ্রোতাদের মনোযোগ কেড়ে নেয়। এরপর পরিবেশন করেন ‘তুমি রবে নীরবে’। প্রেম, মমতা আর গভীর ভালোবাসার অনুভূতিতে ভরা গানটি মুগ্ধ করে উপস্থিত অতিথিদের।

গানের ধারাবাহিকতায় আসে ‘পুরানো সেই দিনের কথা’। পুরোনো বন্ধু, ফেলে আসা সময় আর স্মৃতির আবেশে ভরা গানটির সঙ্গে অনেকেই যেন ফিরে যান জীবনের কোনো এক চেনা অধ্যায়ে। এরপর একে একে শোনান ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’ এবং ‘দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার গানের ওপারে’। পরিচিত সুর আর কথার মায়ায় কেউ নীরবে উপভোগ করেন পরিবেশনা, কেউবা গুনগুনিয়ে গলা মেলান।

রবীন্দ্রসংগীতের বিশেষত্বই হলো, একই গানে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে খুঁজে পাওয়া যায় নতুন অনুভূতি। কখনো প্রেম, কখনো বিরহ, কখনো প্রকৃতির সৌন্দর্য, আবার কখনো জীবনের গভীর উপলব্ধি, নানা আবেগের প্রকাশ ঘটে কবিগুরুর সৃষ্টিতে। সেই আবেগঘন সংগীতের সঙ্গে খাবারের স্বাদ মিলিয়ে সন্ধ্যাটি যেন হয়ে ওঠে আরও অর্থবহ। এখানে গান শুধু খাবার উপভোগের অনুষঙ্গ নয়, পুরো আয়োজনের আবহ তৈরিরও অন্যতম প্রধান অংশ।

তবে হেরিটেজ রেস্টুরেন্টের আকর্ষণ শুধু সংগীতে সীমাবদ্ধ নয়। এর অন্যতম বিশেষত্ব ঐতিহ্যবাহী মোগলাই খাবার। পুরোনো রেসিপি ও রন্ধনপ্রণালীর অনুসরণে তৈরি বিভিন্ন পদের স্বাদে রয়েছে ইতিহাসের অনুষঙ্গ। খাবার পরিবেশনেও রাখা হয়েছে আলাদা আয়োজন। মোগল পোশাকে পরিবেশনকর্মীরা অতিথিদের সামনে তুলে ধরছেন খাবার। রেস্টুরেন্টের সাজসজ্জা থেকে শুরু করে পরিবেশনার ধরন সবকিছুতেই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা রয়েছে রাজকীয় ভোজের আবহ।

আয়োজকদের মতে, এ অঞ্চলের খাদ্যসংস্কৃতিতে মোগল রন্ধনশৈলীর প্রভাব ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের সঙ্গে খাবারের উপকরণ, স্বাদ ও প্রস্তুতপ্রণালীতে পরিবর্তন এলেও সেই ঐতিহ্যের অনেক কিছুই এখনো টিকে আছে। সেই রন্ধনঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা এবং খাবারের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংগীতকে যুক্ত করাই ‘গ্র্যান্ড মিউজিক্যাল নাইট’ এর অন্যতম লক্ষ্য।

আয়োজনটির আরেকটি বিশেষ দিক হলো, প্রতি শুক্রবার থাকছে সংগীতের আলাদা ধারা। অর্থাৎ প্রতিবার একই পরিবেশে এসেও অতিথিরা উপভোগ করতে পারবেন ভিন্ন স্বাদের সংগীতসন্ধ্যা। রবীন্দ্রসংগীতের স্নিগ্ধতা, নব্বইয়ের দশকের হিন্দি গানের নস্টালজিয়া, নজরুলগীতির উদ্দীপনা কিংবা লোকসংগীতের মাটির ঘ্রাণ প্রতিটি পর্বে বদলে যাবে সংগীতের আবহ।

আয়োজকদের দেওয়া সূচি অনুযায়ী, আগামী ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে এ আয়োজন। এর পরবর্তী পর্ব অনুষ্ঠিত হবে ১৩ নভেম্বর। সেদিন মঞ্চে পরিবেশিত হবে নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় হিন্দি গান। এরপর ২০ নভেম্বর থাকছে নজরুলগীতি, ২৭ নভেম্বর কালজয়ী বাংলা গান। ৪ ডিসেম্বর পিয়ানো ও কণ্ঠসংগীত, ১১ ডিসেম্বর শাস্ত্রীয় যন্ত্রসংগীত এবং ১৮ ডিসেম্বর পরিবেশিত হবে লোকসংগীত।

সব মিলিয়ে ‘গ্র্যান্ড মিউজিক্যাল নাইট’ খাবার ও সংগীতপ্রেমীদের জন্য তৈরি করেছে ভিন্নধর্মী এক আয়োজন। যেখানে একদিকে মোগলাই খাবারের ঐতিহ্যবাহী স্বাদ, অন্যদিকে শিল্পীদের সরাসরি পরিবেশনায় প্রিয় গানের মূর্ছনা। ব্যস্ত নগরজীবনের একঘেয়েমি থেকে বেরিয়ে পরিবার কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর এমন আয়োজন মনে করিয়ে দেয়, ভালো খাবার আর ভালো গান একসঙ্গে মিললে সাধারণ একটি সন্ধ্যাও হয়ে উঠতে পারে বিশেষ স্মৃতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights