শোকের মাসে আত্মপ্রচার

রফিকুল ইসলাম রনি
রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের দুই পাশে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে টানানো হয়েছে কয়েকটি বিশাল বিলবোর্ড। কলাবাগান থেকে ৩২ নম্বরে প্রবেশ করতেই হাতের বাঁ পাশে বিশালাকৃতির বিলবোর্ড দেখে চোখ আটকাবে যে-কারও। সেই ব্যানারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ১৫ আগস্ট ঘাতকের হাতে নিহত সব শহীদের ছবি দেওয়া আছে। জাতির পিতার ছবিটা দূর থেকে দেখা গেলেও বাকি শহীদদের দেখতে হাজার পাওয়ারের চশমা প্রয়োজন। নিচের দিকে দুটি ছবি দেওয়া হয়েছে। একটি ছবি সেদিন ঘাতকের হাতে নিহত শহীদ শেখ ফজলুল হক মণি ও আরজু মণির সন্তান ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের। যিনি শোকাহত এ ব্যানার করেছেন তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. মাহবুবুর রহমান মাহবুব। গত মঙ্গলবার এই প্রতিবেদক যখন বিলবোর্ডের ছবি তুলছিলেন, তখন ষাটোর্ধ্ব স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল করিম বলেন, ছবি তোলেন কেন? কোনো উত্তর না দিতেই তিনি বললেন, ‘আপনি সাংবাদিক? ছবি তুলে লিখে কী করবেন? নেতাদের কি লজ্জা হবে? শোকের মাসে এসব পাতিনেতার আত্মপ্রচার যদি শহীদরা দেখতেন, তাহলে কষ্ট পেতেন। আর এ ছবিতে একজন শহীদসন্তানের ছবিও আছে। তিনিও যদি এ ছবি দেখেন তাহলে নিশ্চয় কষ্ট পাবেন।’

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের চারপাশে শুধু বিলবোর্ডই নয়, আছে ব্যানার-ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ডও। শোকের জন্য পোস্টার, ব্যানার, বিলবোর্ড টানানো হলেও শহীদদের কোথাও দেখা যায়নি, আবার কারও কারও পোস্টার, ব্যানারে শহীদদের খুঁজতে হাজার পাওয়ারের চশমার প্রয়োজন হবে। ৩২ নম্বর সড়কে একাধিক ব্যানার ও ফেস্টুন দেখা যায় ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহর। তাঁর ব্যানার, ফেস্টুনে শুধু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি দেওয়া আছে। এতে লেখা আছে, ‘১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ৪৮তম শাহাদাৎ বার্ষিকীতে জানাই শ্রদ্ধাঞ্জলি’। নিচে তাঁর পদপদবি লেখা। বঙ্গবন্ধুর চেয়ে এনায়েত উল্যাহর হাস্যোজ্জ্বল ছবিই বড়। আরেকটি বিলবোর্ড চোখে পড়ে ৩২ নম্বরের মাঝখানে। এ বিলবোর্ডটি টানিয়েছেন সাবেক ছাত্রনেতা অধ্যাপক ডা. এম আলমগীর চৌধুরী। সেখানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি কিছুটা বড় দেওয়া হলেও বিলবোর্ডের মূল ফোকাস আলমগীর চৌধুরীর দিকেই। আর বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবসহ ১৫ আগস্ট নিহত সব শহীদকে খুঁজতেও লাগে দুরবিন। এ বিলবোর্ডটিতে ডান পাশে লেখা আছে, ‘প্রচারে চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনের জনগণ।’ শুধু ধানমন্ডি ৩২ নম্বরেই নয়, প্রতিটি ব্যানার, পোস্টার, ফেস্টুন এমনভাবে দেওয়া আছে ধানমন্ডি আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর কার্যালয়ের সামনে, ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে, তেজগাঁও ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনেসহ কমবেশি গোটা রাজধানীর প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়। এসব শোকের ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুনের বড় অংশ জুড়ে আছে প্রচারকারী স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার ছবি। শোক দিবসের ব্যানারে যা বড্ড বেমানান।

গতকাল বিকালে ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে গিয়ে দেখা যায় অসংখ্য ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড ও পোস্টার। শোকের মাসের একটি ব্যানার টানিয়েছেন ‘বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ’-এর সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন। এ ব্যানারে জাতির পিতার ছবি বড় থাকলেও শহীদদের ছবি ক্ষুদ্র। এ পোস্টারে প্রধানমন্ত্রীর ছবিও আছে। আরেকটি ব্যানার আছে শিশু একাডেমি কেন্দ্র ইউনিট আওয়ামী লীগ ২০ নম্বর শাহবাগ থানা, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের। এ ব্যানারের এক কোণে জাতির পিতার ছবি কোনোমতে ঠাঁই পেয়েছে। আরেক পাশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবিও কিছুটা দূর থেকে চোখে পড়ে। ব্যানারটিতে নুরুল ইসলাম নুরু এবং ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোর্শেদ হোসেন কামালের ঢাউস আকারের ছবি। ছিন্নমূল হকার্স লীগের পক্ষ থেকে একটি ব্যানার টানানো আছে, সেখানেও একই অবস্থা। শহীদদের দেখতে দুরবিন প্রয়োজন। ব্যানারের ছবিতে মূল ফোকাসে রয়েছেন শহীদসন্তান ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম। ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ তাঁতী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মোজাহারুল ইসলাম সোহেলের পোস্টারে অবশ্য জাতির পিতার ছবি অনেক বড়। এরপর প্রধানমন্ত্রীর ছবি। বঙ্গমাতাসহ বাকি শহীদদের দেখতে পাওয়ারের চশমা প্রয়োজন। সোহেলের ছবিও ঢাউস আকারে।
বায়তুল মোকাররমের আশপাশ এলাকায় একাধিক বিলবোর্ড চোখে পড়ে। টাঙিয়েছেন ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের বায়তুল মোকাররম ইউনিট আওয়ামী লীগের সভাপতি সোহরাব উদ্দিন গাজী ও সাধারণ সম্পাদক আবদুর রব ভুইয়া কালু। তাঁদের ঢাউস আকারে ছবি। তাঁদের মাথার ওপরে ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র ফজলে নূর তাপস, মহানগরী দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফী, সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির, পল্টন থানা সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, ওয়ার্ড সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ছবি। ব্যানারের বাঁ পাশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি দেওয়া আছে। নিচে ১৬ জনের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এ শোকব্যানার দেখে অনেকের প্রশ্ন, কারা শহীদ? কীসের শোকব্যানার এটা? ধানমন্ডি ৩-এ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনেও শতাধিক বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন চোখে পড়ে। এর মধ্যে অধ্যাপক ডা. এম আলমগীর চৌধুরী ছাড়াও জামালপুর-৫ আসনের এমপি মোজাফফর হোসেন, শ্রম ও জনশক্তি বিষয়ক উপকমিটির সদস্য এ এস এম রাইসুন হাসান সোয়েবের ঢাউস আকারের ছবি দিয়ে শোকের মাসে আত্মপ্রচার চোখে পড়ে। এ ছাড়া রাজধানীর কোনাপাড়ার মান্নান হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের পক্ষ থেকে ব্যানারে বঙ্গবন্ধুর ছবি দেখা গেলেও বাকি শহীদদের দেখতে দুরবিন প্রয়োজন। কিন্তু স্থানীয় এমপি কাজী মনিরুল ইসলাম মনুর ছবিও অনেক বড়।

রাজধানীতে সারা বছরই বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণায় ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড, পোস্টার ইত্যাদি দেখা যায়। আগস্ট শোকের মাস হওয়ায় আরও বেশি করে এগুলো চোখে পড়ে। এবারও রাজধানীর অলিগলি, দোকান, দেয়াল, গাছ ইত্যাদি সব স্থানই ভরে গেছে বিলবোর্ড, ব্যানার, পোস্টারে। ১৫ আগস্ট কেন্দ্র করে এসব প্রচারণার অনেকাংশেই দেখা যায় বঙ্গবন্ধুর চেয়ে যে নেতা এই প্রচার চালাচ্ছেন তারই জায়গা অধিকাংশ জুড়ে। তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে- এসব প্রচারণা কি শোকের মাস ঘিরে, না নেতাদের ব্যক্তিগত প্রচার?

রাজনীতিবিশ্লেষকরা বলছেন, ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির অবিরত অশ্রু ঝরার দিন। এদিন বাঙালি জাতিসহ সারা বিশ্ব অবিসংবাদিত নেতা ও হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করে বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায়। অথচ এই বিশেষ দিনটি কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতার মধ্যে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানোর নামে আত্মপ্রচার চালানোর প্রবণতা দেখা যায়। এ বছরেও তা বিদ্যমান। এ বছরও আগস্ট শুরু হওয়ার আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দলীয় নেতা-কর্মীদের শোকের মাসে ছবি দিয়ে পোস্টার করতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু আত্মপ্রচারকারী নেতাদের কেউ কর্ণপাত করেননি।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আগস্টে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য কারও ছবি পোস্টার, ফেস্টুনে ব্যবহারে বিশেষ নির্দেশনা থাকলেও তা মানছেন না দলটির অধিকাংশ নেতা-কর্মী। রাজধানীসহ সারা দেশে বড় বড় বিলবোর্ড, পোস্টার আর ফেস্টুনে অনেক ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি এক কোনায় ছোট পরিসরে স্থান পেয়েছে। অন্যদিকে বিজ্ঞাপনের বাকি অংশ জুড়েই রয়েছে সুবিধাবাদী নেতাদের ছবি, নাম, পদবি। এমনকি আত্মপ্রচারের এ সুযোগ হাতছাড়া করেননি কর্মীরাও। আবার সারা দেশের নেতারাও ঢাকায় পোস্টার, বিলবোর্ড, ব্যানার লাগিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে এমপি প্রার্থীরা এ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে। ব্যতিক্রম যে নেই তা-ও নয়। অনেক পোস্টার, বিলবোর্ডে জাতির পিতা ও ১৫ আগস্ট শহীদদের ছবি দেখা গেছে। সেখানে প্রচারকারী নেতাদের নামও ছোট করে দেওয়া আছে।

রাজধানীর নিউমার্কেট, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেটসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরলেই দেখা যায় ১৫ আগস্টের শত শত ব্যানার, ফেস্টুন। কিন্তু এগুলো এমনভাবে স্থান পেয়েছে যে কে শহীদ আর কে জীবিত, অনেক ক্ষেত্রে তা বোঝা কষ্টকর। এ-জাতীয় আত্মপ্রচারের শ্রদ্ধাঞ্জলি ঝুলতে দেখা যাচ্ছে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি চত্বর, সরকারি অফিসের আশপাশ, এমনকি পাড়ামহল্লার রাস্তায়ও।

জাতীয় শোক দিবস সামনে রেখে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীরা নিজেদের ব্যক্তি প্রচারে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এ দিবসের তাৎপর্য, দলীয় অঙ্গীকার, ভিশন ইত্যাদি কোনো কিছুই স্থান পাচ্ছে না কর্মসূচিতে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ১৫ আগস্টের শোকাবহ ঘটনার ভাবগাম্ভীর্যও রক্ষা করা হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘যারা এসব কাজ করে, তারা দিবসের মর্ম বোঝে না। গভীরতা উপলব্ধি করতে পারে না। যদি পারত তাহলে কোন দিবসে কোন ছবি দেওয়া যাবে, কোন ছবি দেওয়া যাবে না তা বিবেচনা করেই সব করত’।

কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা বারবার বলে আসছি শোকের মাসে কোনো আত্মপ্রচার করা যাবে না। তার পরও একশ্রেণির মানুষ এটা করে আসছে। শহীদদের অমর্যাদা করে এমন নির্লজ্জ আত্মপ্রচার নিয়ে দলীয় ফোরামে আলোচনা হতে পারে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights