অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনের পরিকল্পনা প্রয়োজন
ড. খলিলুর রহমান
বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক রোডম্যাপ এবং অর্থনৈতিক ও জ্বালানি কূটনীতিতে নতুন করে জোর দেওয়া। বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন ক্রমবর্ধমান চাপ, শিল্প কার্যক্রমের মন্থরতা এবং বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে-অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনের জন্য সরকারের পরিকল্পনা কোথায়?
ইউনূস প্রশাসনের সময়কার রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রায় দুই বছর পর এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার গঠনের পরও দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য কৌশল এখনো দৃশ্যমান নয়। রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন পক্ষ এখনো মূলত রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ ও ক্ষমতার সমীকরণ নিয়ে ব্যস্ত বলেই মনে হয়। কিন্তু অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জরুরি কাজটি যে কৌশলগত গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল, তা এখনো পুরোপুরি পায়নি।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্য মূলত শিল্প সম্প্রসারণ, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু সেই ভিত্তি এখন নানা চাপের মুখে পড়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে যে গত দুই বছরে বিভিন্ন খাতে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বা তাদের কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। হাজার হাজার শ্রমিক তাদের কর্মসংস্থান হারিয়েছেন বলে জানা যায়।
এর ফলে শুধু শিল্প উৎপাদনই নয়, অভ্যন্তরীণ চাহিদাও দুর্বল হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি রপ্তানি আয়ও পরিবর্তিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তবু এখনো পর্যন্ত দেশের সামনে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের একটি সমন্বিত জাতীয় রোডম্যাপ উপস্থাপন করা হয়নি। এর ফলে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
বর্তমান নীতিগত পরিস্থিতির সবচেয়ে লক্ষণীয় ঘাটতিগুলোর একটি হলো অর্থনৈতিক কূটনীতির অভাব। আজকের বিশ্বায়িত অর্থনীতিতে অর্থনৈতিক কূটনীতি উন্নয়নের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ সক্রিয়ভাবে কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যবহার করে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে, নতুন বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়াচ্ছে, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে এবং কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারি গড়ে তুলছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কিন্তু মনে হচ্ছে অর্থনৈতিক কূটনীতি ঠিক সেই সময়েই অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে সরে গেছে, যখন এটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল। বৃহৎ পরিসরে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ বা বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্কে দেশের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য কোনো সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ এখনো স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না। অথচ এই সময়ে অনেক বহুজাতিক কম্পানি তাদের সরবরাহ শৃঙ্খল নতুনভাবে সাজাতে চাইছে এবং নতুন উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে।
অর্থনৈতিক কূটনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জ্বালানি কূটনীতি। জ্বালানি নিরাপত্তা শিল্প উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি। ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদার এই সময়ে অনেক দেশ দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি অংশীদারি নিশ্চিত করতে সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিচ্ছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা জোরদার করা এবং স্থিতিশীল ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি সুস্পষ্ট জ্বালানি কূটনীতি ছাড়া শিল্প পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগিয়ে নেওয়া কঠিন হতে পারে।
এদিকে হাজার হাজার কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং লাখ লাখ শ্রমিকের যাদের প্রায় ৮৬ শতাংশ মহিলা কর্মসংস্থান হারানোর বিষয়টিও উদ্বেগজনক। শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়া শুধু উৎপাদন কমিয়ে দেয় না; এটি সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যখন কারখানা বন্ধ হয় এবং শ্রমিকরা চাকরি হারান, তখন এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ে- ভোক্তা ব্যয় কমে যায়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যাবসায়িক কার্যক্রমও দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই সমস্যার সমাধান শুধু স্বল্পমেয়াদি প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি লক্ষ্যভিত্তিক শিল্প পুনরুদ্ধার কর্মসূচি, যার মাধ্যমে সম্ভাবনাময় বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালু করা, ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সহায়তা করা এবং নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করা যায়।
আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সংযোগব্যবস্থার বিষয়টিও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পূর্ববর্তী ইউনূস প্রশাসনের সময় প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য পথ ও ট্রানজিট ব্যবস্থায় সৃষ্ট বেশ কিছু উত্তেজনার কারণে আঞ্চলিক বাণিজ্যে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করা হয়। কিছু বিশ্লেষকের মতে, নির্দিষ্ট কিছু স্থলবন্দর ও ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা সীমিত বা বন্ধ হওয়ার ফলে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই সুবিধাসমূহ বন্ধের কারণে প্রতি মাসে বাংলাদেশের হাজার হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। যে অঞ্চলে আন্ত সংযোগ ও সীমান্ত বাণিজ্য দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে, সেখানে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা পুনরুজ্জীবিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া পূর্ববর্তী প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত কিছু বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, এসব ব্যবস্থার কিছু ধারা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বা ফেলেছে এবং প্রতিবছর ১৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির কারণ হতে পারে। বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে—এই বাস্তবতায় এ ধরনের চুক্তিগুলো বিশেষজ্ঞরা পর্যালোচনার জন্য সরকারকে পরামর্শ দিচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই চুক্তি পর্যালোচনার সুযোগ এসেছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো তারেক রহমানের সরকার কি এই সুযোগ গ্রহণ করবে?
সব শেষে বিনিয়োগকারীদের আস্থার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় কিছুটা উন্নত হয়েছে বলে মনে করা হলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নীতিগত স্থিতিশীলতা, বিশ্বাসযোগ্য অর্থনৈতিক নেতৃত্ব এবং একটি সুস্পষ্ট সংস্কার কর্মসূচি দেখতে চান।
একটি দক্ষ ও গতিশীল অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা দল গঠন এই আস্থা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নতুন বিনিয়োগ ছাড়া এবং বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালু না হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি সীমিতই থেকে যাবে।
বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। অতীতে দেশটি অসাধারণ স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে- একটি শক্তিশালী রপ্তানি খাত গড়ে তুলেছে এবং উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু সেই অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে এখন নতুন কৌশলগত দৃষ্টি এবং দৃঢ় নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
দেশের এখন জরুরি প্রয়োজন একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন কৌশল- যেখানে শিল্প পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সেই কৌশলের কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হতে হবে শক্তিশালী অর্থনৈতিক কূটনীতি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে এখন সুযোগ রয়েছে একটি সুস্পষ্ট ও দূরদর্শী অর্থনৈতিক রোডম্যাপ উপস্থাপন করার, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করবে এবং অর্থনীতিতে নতুন গতি আনবে। অনেক পর্যবেক্ষকের কাছে তাই প্রশ্নটি এখনো একই রয়ে গেছে-এই পরিকল্পনাটি কবে সামনে আসবে?
লেখক : সাবেক কূটনীতিক ও অর্থনীতি বিশ্লেষক।
