অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে সরে যেতে পারে জাপান

রুকনুজ্জামান অঞ্জন

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য নির্মিতব্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (বিএসইজেড) প্রকল্পের কার্যক্রম মাঝপথে এসে অনিশ্চয়তায় পড়েছে। শর্ত পূরণ না করায় প্রকল্পটির বিদেশি অর্থায়নকারী জাপান ইন্টারন্যাশনারল কো অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) ঋণ চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে। এক চিঠিতে ৩০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে সংস্থাটি বলেছে, আলোচ্য সময়ের মধ্যে তাদের শর্ত পূরণে আশু পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে- তারা প্রকল্পটিতে অর্থায়ন বন্ধ করে দিতে পারে।

গত ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষর (বেজা) কাছে চিঠিটি পাঠিয়েছে জাইকা। ওই চিঠিতে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ করে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিক বৈঠকের পরও নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে নির্মিতব্য বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (বিএসইজেড) প্রকল্পের সামাজিক ও পরিবেশগত উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চেয়ে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনকে গতকাল সন্ধ্যায় ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। বিষয়টি জানিয়ে মোবাইলে মেসেজ পাঠানো হলেও জবাব দেননি।

সূত্র জানায়, ঋণ চুক্তির দুটি শর্ত উল্লেখ করে জাইকার চিঠিতে বলা হয়, প্রকল্প এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত জমি মালিকদের ক্ষতিপূরণ বাবদ অর্থ বরাদ্দ এবং তাদের জীবনমান উন্নয়নে বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। বিশেষ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘমেয়াদি অনুমোদন প্রক্রিয়ার কারণে এলাকাবাসীর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি ঝুলে গেছে বলে চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে। সংস্থাটি ঋণচুক্তির একাধিক ধারা উল্লেখ করে এ বিষয়টিও মনে করিয়ে দেন যে, জাইকার গাইডলাইন অনুযায়ী ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা জরুরি। সূত্র জানায়, এর আগে গত বছরের আগস্ট, সেপ্টেম্বর এবং নভেম্বরেও একই বিষয়ে তাগিদ দিয়ে চিঠি দিয়েছিল জাইকা। সবশেষ ডিসেম্বরে পাঠানো চিঠিতে অর্থায়ন বন্ধের হুমকি দেয় সংস্থাটি। ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের অর্থ ছাড়ে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখার এক কর্মকর্তা জানান, জেলা প্রশাসকের ছাড়পত্র পাওয়ার পর তারা অর্থ ছাড় করেন। এ ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রক্রিয়াগত কোনো দীর্ঘসূত্রতার কারণ নেই। ওই কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশে জমির মালিকানা ও কাগজপত্র নিয়ে বিস্তর সমস্যা রয়েছে। অনেকক্ষেত্রে জমির মালিকানা দাবি করে মামলা-মোকাদ্দমা হয়। এসব শেষ করে জেলা প্রশাসক ভূমি অধিগ্রহণের ৮ ধারা জারির পর অর্থ ছাড় হয়। এ ছাড়া নিষ্পত্তি না করে অর্থ ছাড় করলে ওই অর্থের ওপর অহেতুক সুদ গুণতে হয়।

চার বছরের প্রকল্প ছয় বছরেও শেষ হয়নি : পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের পর ২০২৩ সালের জুনে এর বাস্তবায়ন কাজ শেষ করার কথা ছিল। অনুমোদনের সময় দেশের প্রথম সরকার টু সরকার (জি টু জি) পর্যায়ের এই অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পটির বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয় ২ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাপানের আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা জাইকার দেওয়ার কথা ২ হাজার ১২৭ কোটি টাকা; বাকি ৪৫৪ কোটি টাকা প্রকল্প সাহায্য হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে বরাদ্দ দেওয়ার কথা। বাস্তবায়ন শেষে লক্ষ্য ছিল ২০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ৩০০টিরও বেশি জাপানি কোম্পানির জন্য সুবিধাজনক শিল্প ও বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা। তবে ভূমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্পটির মেয়াদ দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। ৪ বছরের প্রকল্প দুই বছর সময় বাড়িয়েও শেষ করতে পারেনি বেজা। ওই মেয়াদের কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পটির মেয়াদ আবারও দুই বছর বাড়ানোর জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে বেজা। শুধু তাই নয়, সরকারি তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে সর্বশেষ প্রস্তাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights