অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদেশি বিনিয়োগের নতুন ঢেউ
ইমরান চৌধুরী
বিদেশি বিনিয়োগ টানতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নেওয়া নতুন ‘লিড জেনারেশন ও ইনভেস্টমেন্ট পাইপলাইন’ ব্যবস্থাপনা ইতোমধ্যে ফল দিতে শুরু করেছে। ২০২৫ সালে গড়ে তোলা প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ পাইপলাইন থেকে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিডার তথ্য অনুযায়ী, ২০টি দেশের ৭০ সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীকে নিয়ে গড়ে ওঠা এই পাইপলাইনের সফল রূপান্তর (কনভার্সন) হার ১৫ শতাংশের বেশি, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায়ও ইতিবাচক বলে দাবি করা হয়েছে।
বিডা বলছে, এ পাইপলাইনের প্রধান বিনিয়োগকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে তুরস্ক, চীন, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস ও দক্ষিণ কোরিয়া। এসব দেশের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ, প্রকল্পভিত্তিক সহায়তা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার মাধ্যমে বেশ কয়েকটি বড় বিনিয়োগ চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়েছে।
বিডার নির্বাহী সদস্য নাহিয়ান রহমান রচি বলেন, গত এক বছরে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, প্রকল্পভিত্তিক সমস্যা সমাধান এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের কারণেই এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। শুধু সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর নয়, প্রকল্পকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দেওয়াই এখন আমাদের মূল লক্ষ্য।
বিডার তথ্যানুযায়ী, সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ এসেছে হংকংভিত্তিক হান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড থেকে। বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট-২০২৫-এ প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে ১৫০ মিলিয়ন ডলারের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করলেও পরে বিডা, বেজা ও বেপজার সহযোগিতায় বিনিয়োগ দ্বিগুণ করে ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করেছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে মিরসরাই বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৮০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে পোশাক কারখানা নির্মাণ শুরু হয়েছে, যেখানে প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। দ্বিতীয় ধাপে কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে আরও ২২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে সমন্বিত টেক্সটাইল ও অ্যাপারেল উৎপাদন কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হবে। এতে আরও প্রায় ১৫ হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সব মিলিয়ে এই প্রকল্পে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে।
চীনের শানডং হেংগল টেক্সটাইল টেকনোলজির সহযোগী প্রতিষ্ঠান লিড বাংলাদেশ টেক্সটাইল টেকনোলজি কোম্পানি লিমিটেড নারায়ণগঞ্জের বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোনে (বিএসইজেড) প্রায় ৩৪ দশমিক ৯৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করছে। প্রায় ১২ দশমিক ৬ একর জমিতে গড়ে ওঠা এই কারখানায় উন্নত টেক্সটাইল অ্যাক্সেসরিজ উৎপাদন হবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো কিছু উচ্চমূল্যের টেক্সটাইল উপকরণ স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে এবং আমদানিনির্ভরতা কমবে।
অর্থনৈতিক অঞ্চলে আরেকটি বড় বিনিয়োগ আনছে চীনের লেসো গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে চট্টগ্রামের ন্যাশনাল স্পেশাল ইকোনমিক জোনে ১২ দশমিক ৫ একর জমিতে কারখানা স্থাপন করছে। এখানে পিভিসি ও পিইএক্স পাইপ, সোলার প্যানেল, স্যানিটারি ওয়্যার, কিচেন ইকুইপমেন্ট, দরজা-জানালা, ওয়াটার পিউরিফায়ার, কেবল ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন করা হবে। বিডার মতে, এই বিনিয়োগ নির্মাণ খাতে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া শ্রীলঙ্কাভিত্তিক সফটলজিক লাইফ ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশের আর্থিক খাতে প্রায় ১ দশমিক ৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। অন্যদিকে মালয়েশিয়ার এমআর. ডিআইওয়াই তাদের খুচরা বিক্রয় নেটওয়ার্ক দ্রুত সম্প্রসারণ করছে। বর্তমানে ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির ১৭টির বেশি মেগা স্টোর চালু হয়েছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক মেগারিচ বাংলাদেশে প্রায় ১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করছে। প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের জন্য অন-বোর্ড লাইফস্টাইল পণ্য, ট্রাভেল অ্যামেনিটি কিট, ব্যাগ ও ব্যক্তিগত পরিচর্যাসামগ্রী উৎপাদন করবে। বিডার মতে, এটি তৈরি পোশাক খাতের বাইরে রপ্তানি বহুমুখীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিডার প্রত্যাশা, চলমান পাইপলাইনের সফল বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ২০২৬ সালে নতুন করে আরও ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ পাইপলাইনে যুক্ত করা হবে। সংস্থাটির ভাষ্য, খাতভিত্তিক ও দেশভিত্তিক লক্ষ্য নির্ধারণ করে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ আরও জোরদার করা হবে।
