অ্যাপের ঋণে ভয়ংকর ব্ল্যাকমেলার

ইমরান রহমান

ডিজিটাল মাধ্যম বিভিন্ন অ্যাপে সহজ শর্তে ঋণ নিয়ে প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ছে হাজারো মানুষ। শুরুতে ভালো ব্যবহার করে সামান্য টাকা ঋণ দিতে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি। পরে মূল টাকার সঙ্গে উচ্চ সুদ আদায়ে ওই তথ্যই হয়ে উঠছে প্রতারক চক্রের প্রধান হাতিয়ার। কেউ অভাবে পড়ে কিংবা জরুরি মুহূর্তে ঋণ নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে ভুগছেন। আবার অনেকেই হচ্ছেন নিঃস্ব। এসব চক্র যে শুধু ঋণ দিচ্ছে তা নয়- মোটা অঙ্কের টাকা ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন অঙ্কের টাকাও হাতিয়ে নিচ্ছে। আবার অনেক চক্র আছে- যারা শুধু অনলাইন জুয়া বা ক্যাসিনো খেলতে ঋণ দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিভিন্ন দেশের প্রতারকরা বেতনভুক বাংলাদেশি ব্ল্যাকমেলার নিয়োগ দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। এসব অ্যাপে একবার সব তথ্য দিয়ে দিলে ঋণ পরিশোধের পরও থেকে যাচ্ছে ব্ল্যাকমেলে পড়ার ঝুঁকি। এদিকে অনুমোদনহীন মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ডিজিটাল মাধ্যমে ঋণ কার্যক্রম থেকে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। একই সঙ্গে অ্যাপস বা ঋণদাতা প্ল্যাটফর্ম থেকে ঋণ না নেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু এরপরও বিভিন্ন প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ছে সাধারণ মানুষ। গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, চক্রগুলো বিভিন্ন নারীকে ব্লাকমেল করার প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরির নামে মানুষকে নিঃস্ব করার কাজে নামিয়েছে। সমাজ মাধ্যমে কেউ ঋণের চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে অ্যাপস ইনস্টল করলেই অনেক ক্ষেত্রে ওই ফোনের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় চক্রের কাছে। পরে যে গ্রাহক যোগাযোগ করেন তাকে শুরুতে ৬ হাজার টাকা ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়। এ সময় চক্রের সদস্যরা গ্রাহককে স্যার সম্বোধন করে সব বিষয়ে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে থাকেন। ঋণ পেতে প্রথমে শর্ত দেওয়া হয়- এনআইডি কার্ড, বিভিন্ন এঙ্গেলের ছবি, পরিবারের সদস্যদের নাম ও ফোন নম্বর। ঋণ নেওয়া সবাই এসব তথ্য সরবরাহ করেন।

শর্ত অনুযায়ী ৬ হাজার টাকা নিলে সাত দিন পর ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে। গ্রাহকের সব তথ্য পাওয়া হয়ে গেলে, ঋণের ৬ হাজার টাকা থেকে সার্ভিস চার্জ হিসেবে ১২০০ টাকা কেটে রাখা হয়। অর্থাৎ মাত্র ৪৮০০ টাকা ঋণ নিয়ে ৭ দিনের মধ্যে ১০৯ শতাংশ সুদসহ ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করতেই হবে। ৭ দিনে টাকা পরিশোধ করতে না পারলে যত দিন যাবে জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকবে সুদ। যা কখনো কখনো ৫০০ শতাংশও হয়ে যায়।

সূত্র জানায়, ঋণ নেওয়ার ৫ম দিন থেকে প্রথমে এক নারী টাকা পরিশোধের বিষয়টি গ্রাহককে মনে করিয়ে দেন। ৬ষ্ঠ দিনে যদি কোনো গ্রাহক সময় চান বা এত পরিমাণ সুদ কেন দেবেন বলে জানতে চান, তখন থেকেই শুরু হয় গালিগালাজ। আগে পাঠানো বিভিন্ন এঙ্গেলের ছবি দিয়ে বানানো হয় অসামাজিক ছবি। যেগুলো পরিবারের কাছে পাঠানোর হুমকি দিয়ে শুরু হয় ব্লাকমেল। এ কাজ যারা করেন তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। গত ৩১ আগস্ট এমনই এক চক্রের ৪ সদস্যকে রাজধানীর নর্দা কালাচাঁদপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তাররা হলেন- মোছা. লিলুফা ইয়াসমিন, কাজলি রেখা, কাকলি আক্তার ও তানজিলা আক্তার। এদের মধ্যে লিলুফা ও কাজলি কাস্টমারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা উত্তোলনের কাজ করতেন এবং মাসিক ১৬ হাজার টাকা বেতন পেতেন। কাকলি চক্রের সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাস্টমারদের হেনস্তা করে টাকা তুলতেন। আর কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গ্রাহকদের ছবি এডিট বা বিকৃত করে ব্ল্যাকমেল করার মূল কাজটি করতেন তানজিলা আক্তার। তারাও মাসে বেতন পেতেন ১৮ ও ২৫ হাজার টাকা। ডিবি জানিয়েছে, এই চক্রটি ফেসবুক ও ইউটিউবে সহজ শর্তে ৫ মিনিটে লোনের চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করত। গ্রাহকরা ফিনক্যাশ ও পপক্যাশসহ বিভিন্ন অবৈধ অ্যাপ ডাউনলোড করলেই তাদের ফোনের কন্টাক্ট লিস্ট এবং গ্যালারির সমস্ত ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য চীনা সার্ভারে চলে যেত। পরবর্তীতে উচ্চ হারে প্রসেসিং ফি কেটে সামান্য টাকা দিয়ে মাত্র ৭ দিন পর পুরো টাকা চড়া সুদে দাবি করা হতো। এ বিষয়ে ডিবির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের (দক্ষিণ) যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অ্যাপে ঋণের নামে হয়রানি করা চক্রগুলোকে গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে- এ ধরনের প্রতারণা বা ব্লাকমেলে পড়লে কেউ অভিযোগ করেন না বা করতে চান না। অভিযোগ পেলেই ঋণের নামে সক্রিয় অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights