আগুন পোহাতে বাড়ছে মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী

রাজশাহীতে চলতি শীতে আগুন এবং গরম পানিতে পোড়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছেই। গত নভেম্বর ও ডিসেম্বরেই ২৫২ জন পোড়া রোগী ভর্তি হয়েছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এর বাইরে জরুরি বিভাগ থেকে আরও অন্তত ৩০০ জন রোগী প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি চলে গেছেন। বিশেষ করে আগুন পোহাতে গিয়ে এবং গরম পানি করতে গিয়ে এখন বেশি মানুষ পুড়ছে। তাদের মধ্যে শিশু ও নারীর সংখ্যাই বেশি। এর মধ্যে মারা গেছে ১৩ জন রোগী। হাসপাতালে এখনো ভর্তি আছে ৫৫ জন রোগী। প্রতিদিনই হাসপাতালে আসছে নতুন নতুন পোড়া রোগী। শিশু থেকে শুরু করে মধ্যবয়স্ক এবং বয়স্ক প্রায় সব বয়সের পোড়া রোগীই আসছে চিকিৎসা নিতে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে গিয়ে দেখা গেছে, পোড়া রোগীদের চিত্র। কারও হাত পুড়েছে, তো কারও পাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়ে গেছে। কারও পুড়েছে মুখ ও মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ। গত ২৮ ডিসেম্বর গোদাগাড়ীর প্রেমতলী এলাকায় শীত তাড়াতে বাড়ির পাশে খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ হন দুই নারী। তাদের দুজনের বয়স পঞ্চাশের ওপরে। তারা হলেন রুবিয়া খাতুন (৭০) এবং জাকিয়া খাতুন (৫৫)। রুবিয়ার বোন শিউলি বেগম জানান, দুজনের মধ্যে রুবিয়া খাতুনের শরীরের ১৪ ভাগ পুড়ে গেছে। দুই পা ও কোমর পর্যন্ত পুড়ে গেছে তার। শরীরের দুটি স্পর্শকাতর অংশ পুড়ে যাওয়ায় পায়খানা-প্রস্রাব বন্ধ হয়ে গেছে তার। ফলে তিনি খেতেও পারছেন না।

শীতের সঙ্গে বাড়ছে রাজশাহী অঞ্চলে পোড়া রোগীর হার

অধ্যাপক আফরোজা নাজনীন

রামেক বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট ইনচার্জ

গত বৃহস্পতিবার এ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় মাত্র দুই বছরের শিশু রাজা হোসেনকে। তার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদরের চাঁদলাই মোল্লাপাড়া এলাকায়। সে ওই এলাকার মাসুদ রানার ছেলে। তার মা গরম পানি করে ছেলেকে গোসলের জন্য ছাদে নিয়ে যান। সেই পানিতে পুড়ে বাম পা ঝলসে গেছে শিশুটির। মাসুদ রানা বলেন, ‘আমার স্ত্রীর অসচেতনতার কারণে ছেলে রাজা পুড়ে গেছে। এখন কী করব। চিকিৎসা করাচ্ছি।’ গত ২৮ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভোলহাট এলাকার দুই বছর চার মাসের শিশু রুবাইয়া চা পানের জন্য প্লাস্টিকের জগে করা গরম পানিতে পুড়ে দগ্ধ হয়। তার মুখসহ বুক এবং শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়ে যায়।

রামেক সূত্রমতে, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ এর জুন পর্যন্ত এক বছরে রাজশাহী হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ওয়ার্ডের আওতায় বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে ৫ হাজার ১৩৮ জন পোড়া রোগী। এর মধ্যে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ২ হাজার ৭১ জন। যাদের প্রায় ৬০ ভাগই হলো শিশু। এর পরে নারী প্রায় ৩০ ভাগ এবং পুরুষ ১০ ভাগ। হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের ৫১টি শয্যায় ভর্তিকৃত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। আর বহির্বিভাগে সপ্তাহে পাঁচ দিন। ফলোআপ চিকিৎসা দেওয়া হয় সপ্তাহের তিন দিন।

হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের ইনচার্জ ও অধ্যাপক আফরোজা নাজনীন আশা বলেন, শীতের সঙ্গে বাড়ছে রাজশাহী অঞ্চলে পোড়া রোগীর হার। মানুষের অজ্ঞতা এবং অসাবধানতায় যেমন পোড়া রোগী বাড়ছে, তেমনই মৃত্যু ও বিকলাঙ্গতাও বাড়ছে। বিশেষ করে গরম পানি করতে গিয়ে এবং আগুন পোহাতে গিয়ে সচেতন হতে হবে বেশি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights