আপিল বিভাগে নজিরবিহীন ঘটনা: বার সভাপতির অভিযোগে ক্ষুব্ধ প্রধান বিচারপতি

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (বার অ্যাসোসিয়েশন) সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের মধ্যে চরম উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনিক স্থবিরতা, বিচারিক বিলম্ব ও বেঞ্চ সংকটসহ প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে সরাসরি একাধিক গুরুতর অভিযোগ এনেছেন বার সভাপতি। এই ঘটনার জেরে প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারক বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত রেখে এজলাস ত্যাগ করেন।
মঙ্গলবার সকালে আপিল বিভাগের বিচারকাজ চলাকালে এ নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে এক সংবাদ সম্মেলনে সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন ঘটনার বিস্তারিত ও প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে তাঁর তোলা নির্দিষ্ট অভিযোগসমূহ সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে ব্যারিস্টার খোকন মূলত ৫টি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে ক্ষোভ ও অভিযোগ প্রকাশ করেন:
আদালত পরিচালনায় স্থবিরতা ও বেঞ্চ সংকট: মাহবুব উদ্দিন খোকন অভিযোগ করেন, বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মামলা শুনানির গতি অস্বাভাবিক কমে গেছে। পূর্বে আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারপতির সমন্বয়ে তিনটি বেঞ্চ সক্রিয় থাকলেও বর্তমানে মাত্র একটি বেঞ্চ সচল রয়েছে। ফলে দ্রুত শুনানি ব্যাহত হচ্ছে এবং বিচারপ্রার্থী মানুষ দীর্ঘকাল ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।
আইনজীবীদের পেশাগত আয় সংকট: বিচারিক গতি শ্লথ হয়ে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব আইনজীবীদের ওপর পড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিয়মিত মামলা শুনানি না থাকায় বিশেষ করে সাধারণ ও জুনিয়র আইনজীবীদের পেশাগত কাজ ও আয় মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
চেম্বার আদালতের আদেশে দীর্ঘসূত্রতা: চেম্বার আদালত থেকে কোনো মামলায় স্থগিতাদেশ (স্টে) বা ইনজাংশন দেওয়া হলে তা শুনানির জন্য দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখা হয়। আপিল বিভাগে শুনানির সুযোগ না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে এক বছর বা তারও বেশি সময় ধরে স্থগিতাদেশ বলবৎ থাকে, যা বিবাদীদের ওপর অন্যায় চাপ সৃষ্টি করছে।
জুনিয়র আইনজীবীর ওপর অতিরিক্ত জরিমানা: তথ্য গোপনের অভিযোগে সম্প্রতি একজন জুনিয়র আইনজীবীকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করার আদেশকে ‘অত্যধিক কঠোর’ বলে মন্তব্য করেন বার সভাপতি। তিনি বিচারিক সহানুভূতির খাতিরে ওই আইনজীবীকে ক্ষমা করার অনুরোধ জানালেও আদালত তা প্রত্যাখ্যান করে।
‘মেনশন’ করার সুযোগ বন্ধ: আপিল বিভাগের দৈনন্দিন কার্যতালিকায় মামলার ক্রম পরিবর্তন বা জরুরি প্রয়োজনে বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ (মেনশন) করার ঐতিহ্যবাহী নিয়মটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত:
কোর্টসূত্রে জানা গেছে, সকালে শুনানি চলাকালে উক্ত বিষয়গুলো নিয়ে বার সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকন সরাসরি কথা বলা শুরু করলে প্রধান বিচারপতির সাথে তাঁর তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। বাকবিতণ্ডা একপর্যায়ে চরম আকার ধারণ করলে প্রধান বিচারপতি ও তাঁর নেতৃত্বাধীন অপর চার বিচারপতি এজলাস ত্যাগ করে খাসকামরায় চলে যান।
সর্বোচ্চ আদালতে ঘটে যাওয়া এমন অপ্রীতিকর ও অভূতপূর্ব ঘটনায় আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের মাঝে চরম উৎকণ্ঠা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতি ও বার সভাপতির আনা অভিযোগের বিষয়ে প্রধান বিচারপতি বা সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights