আমেরিকা যেখানে ব্যর্থ, জে-৩৬ যুদ্ধবিমানের জন্য সেই অস্ত্রই আনছে চীন
অনলাইন ডেস্ক
চীনা প্রতিরক্ষা শিল্পের সাম্প্রতিক কিছু চমকপ্রদ অগ্রগতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুদ্ধবিমানে শক্তিশালী লেজার অস্ত্র সংযোজনের বহু বছরের আকাঙ্ক্ষা অবশেষে বাস্তবতা পেতে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অ্যারোস্পেস ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন অফ চায়না (এভিআইসি) একটি প্রতিরক্ষা প্রদর্শনীতে ডিরেক্টেড-এনার্জি অস্ত্রের পরিকল্পনা তুলে ধরেছে। একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি চীনের ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের জন্য উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন লেজার অস্ত্র তৈরির সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ।
প্রদর্শনীতে এভিআইসি-র অধীনস্থ বেইজিং প্রিসিশন ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট ফর এয়ারক্রাফট ইন্ডাস্ট্রি একটি ট্র্যাক অ্যান্ড এইমিং সিস্টেম প্রকাশ করে, যার ওজন ৩৮০ কিলোগ্রামের নিচে এবং এটি অন্তত ১০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ শক্তি তৈরি করতে সক্ষম। এই ব্যবস্থার প্রদর্শনীতে ব্যবহৃত জে-৩৬ বিমানটি একটি ভারী, তিন-ইঞ্জিনবিশিষ্ট ষষ্ঠ প্রজন্মের ফাইটার-বোম্বার, যা ২০২৪ সালের শেষের দিকে প্রথম আকাশে উড়তে দেখা গিয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা, ড্রোন নিষ্ক্রিয় করা কিংবা প্রতিপক্ষের এয়ার-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্রের অপটিক্যাল সিকারকে অন্ধ করে দেওয়ার মতো শক্তিশালী ডিভাইস বহনের জন্য প্রয়োজনীয় পে-লোড ও বিদ্যুৎ শক্তি জে-৩৬ বিমানে রয়েছে।
বায়ুবাহিত লেজার প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অ্যারোডাইনামিক জটিলতা, কম্পন এবং অতিরিক্ত উত্তাপ নিয়ন্ত্রণের মতো কঠিন কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যেগুলোর কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সমমানের প্রজেক্টগুলো থমকে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও চীনের এই উদ্যোগ পশ্চিমা বিশ্বের দূরপাল্লার অস্ত্রের বিরুদ্ধে একটি সক্রিয় এবং গোলাবারুদ-মুক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ার পথে বড় পদক্ষেপ। তবে এই প্রযুক্তির ফ্লাইট ট্রায়াল শুরু হয়েছে কি না, তা এখনও প্রকাশ্য কোনো তথ্যে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
চীনের জে-৩৬-এর মতো ভারী ষষ্ঠ প্রজন্মের ফাইটার এয়ারক্রাফটগুলো এই লেজার অস্ত্রের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে, কারণ সাধারণ ছোট কৌশলগত ফাইটারগুলোতে স্থান, ওজন ও শক্তির যে সীমাবদ্ধতা থাকে, তা এখানে নেই। যদিও ষষ্ঠ প্রজন্মের ফাইটার বিমানের কোনো নির্দিষ্ট সর্বজনীন সংজ্ঞা নেই, তবে এটি নতুন ধরনের প্রযুক্তির যুগান্তকারী অগ্রগতির প্রতিনিধিত্ব করে। এর মধ্যে রয়েছে মানব-মানবহীন দলের সমন্বয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত স্বায়ত্তশাসিত পরিচালনা, শেপ-শিফটিং কাঠামো, ডিরেক্টেড-এনার্জি অস্ত্র এবং ব্রড-স্পেকট্রাম স্টিলথ ক্ষমতা।
আকাশপথে আসা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা এয়ার-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিষ্ক্রিয় করতে অন্তত ১০০ কিলোওয়াটের শক্তি প্রয়োজন, যার জন্য বিপুল বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জটিল কুলিং বা শীতলীকরণ পরিকাঠামো দরকার হয়। আনুমানিক ৫০ থেকে ৫৫ টন টেক-অফ ওজন, ২০ মিটারের মতো ডানার বিস্তার এবং তিন-ইঞ্জিনবিশিষ্ট লেজহীন জে-৩৬ বিমানে প্রয়োজনীয় স্থান ও শক্তি রয়েছে। ফলে মূল স্টিলথ ফিচারে কোনো ছাড় না দিয়েই এটি এই ভারি ডিরেক্টেড-এনার্জি সিস্টেম বহন করতে পারবে। এই ব্যবস্থা আলোকে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের আঘাত প্রতিরোধ করবে, যা গতানুগতিক ফিজিক্যাল অ্যামুনিশন বা ক্ষেপণাস্ত্র শেষ হয়ে যাওয়ার চিন্তামুক্ত থেকে দীর্ঘমেয়াদী টহল নিশ্চিত করবে।
আমেরিকাও একসময় ফাইটারে লেজার অস্ত্র যুক্ত করার চেষ্টা করেছিল, তবে পরবর্তীতে তা বাতিল করে দেওয়া হয়। ২০২২ সালের জুলাইয়ে ‘দ্য ওয়ার জোন’ (টিডব্লিউজে) জানিয়েছিল যে, মার্কিন বিমানবাহিনী ‘শিল্ড’ কর্মসূচির অধীনে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার জন্য লকহীদ মার্টিনের ১০০ কিলোওয়াটের নিচের ল্যান্স পড লাভ করেছিল। তবে ২০২৪ সালের মে মাসে কোনো ফ্লাইট টেস্ট ছাড়াই উদ্যোগটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। আকার, ওজন ও পাওয়ারের সীমাবদ্ধতা, তাপ নিষ্কাশনের ব্যর্থতা, বিমানে অতিরিক্ত কম্পন ও বাতাসের প্রতিকূলতার কারণে লেজার বিম লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া ছিল এর প্রধান কারণ। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত মার্কিন কর্মকর্তারা এর মূল্যায়ন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন।
অথচ বিমানের লেজার অস্ত্রের প্রতি শটে খরচ প্রায় নগণ্য, যা ড্রোন আক্রমণের মতো সস্তা লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে অত্যন্ত সাশ্রয়ী। কারণ সস্তা ড্রোনের পেছনে মিলিয়ন ডলারের এয়ার-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া অর্থনৈতিকভাবে চরম লোকসান। প্রয়োজনীয় শক্তি সংস্থান ও তাপ নিয়ন্ত্রণ ঠিক থাকলে লেজার অস্ত্রের ম্যাগাজিন ফুরিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের সাশ্রয়ী অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা কতটা জরুরি, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
‘এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস ম্যাগাজিন’-এর চলতি মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি আত্মঘাতী ড্রোনের ঝাঁক মোকাবিলা করতে এবং গোলাবারুদের খরচ কমাতে মার্কিন বিমানবাহিনী এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল বিমানগুলোতে তড়িঘড়ি করে লেজার-গাইডেড রকেট যুক্ত করে। এক একটি সস্তা ড্রোন ধ্বংস করতে ১০ লাখ ডলারের এআইএম-১২০ অথবা ৫ লাখ ডলারের এআইএম-৯এক্স সিডউইন্ডার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে গিয়ে বিমানগুলোর অস্ত্রাগার দ্রুত শূন্য হয়ে পড়ছিল। তাই অ্যাডভান্সড প্রিসিশন কিল ওয়েপন সিস্টেম (এপিকেডব্লিউএস) ব্যবহার করে প্রতিটি রকেটের খরচ ৩৫ হাজার ডলারে নামিয়ে আনা হয়, যা একটি এফ-১৫ই-কে ৪২টি পর্যন্ত রকেট বহনের সুযোগ দেয়। তবে ৩৫ হাজার ডলারের রকেটও লেজারের শটপ্রতি মাত্র ৩ ডলার খরচের তুলনায় অনেক ব্যয়বহুল।
অন্যদিকে বৃহৎ উৎপাদন ক্ষমতার ওপর ভর করে চীন এই ধরনের ড্রোনের খরচ অবিশ্বাস্য মাত্রায় কমিয়ে এনেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের নভেম্বরে ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়ার প্রতিবেদনে জানানো হয়, চীন ‘ফেইলং-৩০০ডি’ নামক আত্মঘাতী ড্রোন তৈরি করেছে যার ইউনিট প্রতি খরচ মাত্র ১০ হাজার ডলার। এটি ইরানি শাহেদ সিরিজের ড্রোনের (যার মূল্য ২০ থেকে ৮০ হাজার ডলার) চেয়েও অনেক সস্তা।
পরিস্থিতির গভীরতা বিবেচনা করে ২০২৬ সালের আগস্টে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ডিরেক্টরেট থেকে জানানো হয় যে, মার্কিন প্রতিরক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ড্রোন প্রতিরোধে হালকা ও আরও কার্যকরী বায়ুবাহিত ডিরেক্টেড-এনার্জি অস্ত্র তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে। শুধুমাত্র কনসেপ্ট বা নকশা নয়, বাস্তবভিত্তিক হার্ডওয়্যার সরবরাহের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
তবে এ ধরনের অত্যাধুনিক ডিরেক্টেড-এনার্জি সিস্টেম মোতায়েনের জন্য উপযুক্ত যুদ্ধবিমান প্রয়োজন, যে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ষষ্ঠ প্রজন্মের ফাইটার কর্মসূচি চীনের দ্রুতগতির প্রোটোটাইপিংয়ের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট (এসসিএমপি) জানায়, চীন ইতোমধ্যেই জে-৩৬-এর প্রায় পাঁচটি প্রোটোটাইপ তৈরি করে ফেলেছে, যেগুলোর প্রতিটিতে ক্রমান্বয়ে নকশাগত উন্নয়ন করা হয়েছে। এর প্রথম মডেলে কেয়ারেট-আকৃতির এয়ার ইনটেক ও ট্যান্ডেম ল্যান্ডিং গিয়ার থাকলেও পরবর্তী মডেলে ডাইভার্টারলেস সুপারসনিক ইনটেক এবং নতুন এক্সজস্ট নকশা আনা হয়েছে, যা বিমানের স্টিলথ ও গতিশীলতা বাড়াবে।
বিপরীতে, মার্কিন এফ-৪৭ প্রোগাম ডিরেক্টর জেনারেল ডেল হোয়াইট এই মাসে নিশ্চিত করেছেন যে, মার্কিন বিমানবাহিনী এবং বোয়িং তাদের ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের প্রথম পরীক্ষামূলক উড়াল ২০২৮ সালের দিকে শেষ করার লক্ষ্য নিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন ১৮৫টি এফ-২২ র্যাপ্টর প্রতিস্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে এনজিএডি প্রকল্পের আওতায় এই উদ্যোগের সূচনা করেছিল। ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে শত কোটি ডলারের বাজেটে কাজ এগোলেও শিল্প পরিকাঠামো ও কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে গতি কিছুটা শ্লথ।
ষষ্ঠ প্রজন্মের বিমানে যে দেশ প্রথম সফলভাবে ডিরেক্টেড-এনার্জি বা লেজার সিস্টেম যুক্ত করতে পারবে, তারা কেবল গোলাবারুদের পেছনে আকাশচুম্বী খরচ থেকেই বাঁচবে না, বরং আধুনিক আকাশযুদ্ধে প্রতিপক্ষের ওপর এক অপ্রতিরোধ্য ও দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত আধিপত্য অর্জন করবে।
সূত্র: এশিয়া টাইমস
