আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে গ্রামীণ বিপ্লব

স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার পালাবদলে দেশের অর্থনীতি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যুগান্তকারী অগ্রগতি ঘটেছে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে। বিশেষ করে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা দেশের আর্থিক খাতে নতুন গতি এনেছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবা পৌঁছাতে পারেনি সেখানেও মানুষ এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সহজেই লেনদেন করতে পারছে। প্রয়োজনে নগদ টাকা ওঠাতে পারছে, করতে পারছে সঞ্চয় ও বাণিজ্যিক লেনদেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই দশক আগেও যেখানে বিদেশ থেকে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের অর্থ ওঠাতে এক সপ্তাহ সময় লেগে যেত এখন মিনিটেরও কম সময়েই সেই টাকা ওঠানো যায়। আর এ অর্থ ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা থেকে শুরু করে ব্যবসাবাণিজ্য, স্বাস্থ্যসেবা, ক্ষুদ্র বাণিজ্য, গ্রামীণ কৃষি, গৃহস্থালি-সবকিছুতেই ব্যবহার হচ্ছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নীরবে বিপ্লব ঘটিয়ে চলছে।

চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বৈশ্বিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সূচক (ফিনডেক্স) অনুযায়ী ২০২৪ সালে বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে (১৫ বছরের ঊর্ধ্বে) ব্যাংক, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং মোবাইল ফোনে আর্থিক সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানে থাকা অ্যাকাউন্ট বা হিসাব থাকার হার ৪৩ শতাংশ। তিন বছর আগের তুলনায় এটি কিছুটা কম হলেও বাংলাদেশে শুধু মোবাইল মানি অ্যাকাউন্ট থাকা জনগোষ্ঠীর হার ১০ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দেশে এমএফএস অ্যাকাউন্ট দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ কোটি ৯৩ লাখে-যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এমএফএস লেনদেনও বেড়েছে ৩২ শতাংশের বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপম্যান্টের (র‌্যাপিড) নির্বাহী পরিচালক ড. এম আবু ইউসুফ বলেন, গ্রামীণ কৃষি হোক বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দরিদ্র নারী-পুরুষ এখন ঘরে বসে ব্যাংকিং সেবা নিতে পারছে। এজন্য তাকে কোথাও যেতে হচ্ছে না। খুব বেশি খরচও করতে হচ্ছে না। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যাংকিং নাগরিক লেনদেনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অগ্রগতি : সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে ইন্টারনেট ব্যাংকিং বাড়ছে। বর্তমানে প্রায় ৮০ লাখ গ্রাহক নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহার করছে। এসব সেবার মাধ্যমে শহরের মানুষ ঘরে বসেই সহজে টাকা স্থানান্তর, বিল পরিশোধ, রিচার্জ, টিকিট ক্রয়, কার্ড বিল প্রদানসহ নানা আর্থিক কাজ সম্পন্ন করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে ইন্টারনেট ব্যাংকিং গ্রাহকের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৩ লাখ ৬৬ হাজার ৫৬৩ জন। জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ১৬ লাখ ৪২ হাজার ৫৯৪ জন। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে যেখানে ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহার ২৫ শতাংশ ছিল, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪ শতাংশে। ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের আর্থিক খাত গত এক যুগে মোবাইল আর্থিক সেবার কারণে এক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। বিকাশ, নগদ, রকেট, পকেটসহ বিভিন্ন এমএফএস প্রতিষ্ঠান ও অনুমোদনপ্রাপ্ত ডিজিটাল ওয়ালেট লাখ লাখ মানুষকে ডিজিটাল লেনদেনের স্বাদ দিচ্ছে। টাকা পাঠানো বা বিল পরিশোধের পাশাপাশি আমানত রাখা, ঋণ গ্রহণ, আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স এবং বিনিয়োগের মতো সেবা মোবাইল ফোন থেকেই করা যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের সেলফিন অ্যাপস ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের নেক্সাস পে, সিটি ব্যাংকের সিটি টাচ, ব্র্যাক ব্যাংকের আস্থা, ইস্টার্ণ ব্যাংকের স্কাই ব্যাংকিংসহ আরও কয়েকটি অ্যাপস ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

গ্রামের পাশাপাশি শহুরে মানুষের স্বাচ্ছন্দ্য ব্যাংকিং সেবায় ই-ওয়ালেট নিয়ে এগিয়ে এসেছে কয়েকটি কোম্পানি। বাংলাদেশে এবিজি টেকনোলজিসের ‘পকেট’ তেমনি একটি জনপ্রিয় ই-ওয়ালেট, আর সোনালী ব্যাংকের ‘সোনালী ই-ওয়ালেট’ও একটি পরিচিত সেবা, যা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ব্যাংক ও ওয়ালেট উভয় সুবিধা দিচ্ছে। পকেট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পকেট ই-ওয়ালেটের রয়েছে একটি আধুনিক ও গ্রাহকবান্ধব মোবাইল অ্যাপ যা ব্যবহার করে গ্রাহক খুব সহজেই নিরাপদ ও দ্রুত পেমেন্ট করতে পারে। কেনাকাটা ছাড়াও মোবাইল রিচার্জ, সেন্ড মানি রিকোয়েস্ট মানি, ক্রেডিট কার্ড বিল, সেলারি ডিসবার্সমেন্ট এবং বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ বিভিন্ন সেবার পেমেন্ট দেওয়ারও সুযোগ রয়েছে পকেট ই-ওয়ালেট থেকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে এসে, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হয়েছে। ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে মর্যাদাপূর্ণ উত্তরণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে বাংলাদেশ। বছরের পর বছর ধরে রেমিট্যান্স, রপ্তানি, কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, ক্ষুদ্রঋণ এবং শ্রমশক্তিতে নারীর ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণের মতো বিষয়গুলো দারিদ্র্য বিমোচন এবং বেশ কিছু মানব উন্নয়ন সূচকের উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অর্থনীতিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করছে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ। তবে এসব উদ্যোগের পরও ডিজিটাল পেমেন্টে দক্ষিণ এশিয়ায় এখনো পিছিয়ে বাংলাদেশ। ভারতের ৪৮ শতাংশ ও শ্রীলঙ্কার ৪৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নিয়মিত ডিজিটাল পেমেন্ট করলেও বাংলাদেশ, নেপাল ও পাকিস্তানে এই হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বিশেষ করে প্রান্তিক এলাকায় ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ব্যবহারে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অদক্ষতা আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে বড় ধরনের বাধাগ্রস্ত করছে। অধ্যাপক এম আবু ইউসুফ বলেন, বাংলাদেশ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। এ ক্ষেত্রে সরকার সঠিক নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা অর্জন করতে পারে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি থেকে সব নাগরিকের সুবিধা নিশ্চিত করা কেবল সমতার প্রশ্ন নয়-এটি জাতীয় স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতার ভিত্তি তৈরি করে দেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights