ইতালিতে বাবার মৃত্যু, মরদেহ দেশে আনতে মেয়েদের আকুতি

বাগেরহাট প্রতিনিধি

সংসারের অভাব ঘোচানো, ছোট ছোট তিন মেয়ের মুখে হাসি ফোটানো আর ভাগ্য বদলের স্বপ্ন নিয়ে ঋণ করে ইউরোপে পাড়ি জমান বাগেরহাট সদর উপজেলার বেমরতা ইউনিয়নের শিমুলতলা গ্রামের জিন্নাত খান খোকন। কিন্তু সেই স্বপ্ন যেন অধরাই থেকে যায়।

ঋণের বোঝা ও হতাশার মধ্যে ইতালিতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন এই প্রবাসী। ইতালিতে প্রবাসী বাবার মরদেহ দেশে আনতে তিন মেয়ের সরকারের কাছে আকুতি জানিয়েছেন।

জিন্নাত খান খোকন শিমুলতলা গ্রামের লুৎফর রহমান খানের ছেলে। তিনি স্ত্রী সুমি বেগম, বড় মেয়ে জেরিন আক্তার (১২), মেজো মেয়ে জিনিয়া খানম (৮), আড়াই বছরের ছোট মেয়ে জাকিয়া আক্তার এবং ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা জরিনা বেগমকে রেখে গেছেন।

জিন্নাত খান খোকনের স্ত্রী সুমি বেগম জানান, উন্নত জীবনের আশায় দালালের মাধ্যমে প্রায় ৩৫লাখ টাকায় খোকন প্রথমে বৈধভাবে বুলগেরিয়ায় যান। পরে সেখান থেকে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইতালিতে প্রবেশ করেন। বিদেশযাত্রার জন্য তিনি নিজের বসতভিটাসহ পরিবারের শেষ সম্বলও বিক্রি করে দেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণও নিতে হয়।

উন্নত জীবনেরও জন্য ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর দেশ ছেড়ে বিদেশে গিয়েও ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি। বরং ঋণের চাপ, অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। একপর্যায়ে গত শুক্রবার ইতালিতে আত্মহত্যা করেন বলে পরিবারের কাছে খবর আসে। স্বামীকে বিদেশ পাঠাতে অনেক কষ্ট করেছি, ঋণ করেছি। এখন তার মরদেহ দেশে আনার টাকাও আমাদের নেই। ছোট ছোট তিনটি মেয়েকে নিয়ে কীভাবে জীবন চলবে, সেটাও জানি না।

খোকনের মামাতো ভাই শেখ তানভির হাসান বলেন, বিদেশে যাওয়ার জন্য খোকন নিজের ভিটেমাটিও বিক্রি করেছিল। পরিবারের ভালো ভবিষ্যতের আশায় সে দেশ ছেড়েছিল। কিন্তু ঋণের চাপ ও হতাশাই শেষ পর্যন্ত সে ইতালিতে আত্মহননের পথ বেছে নিলো। এই অবস্থায় খোকনের পরিবার একেবারেই অসহায় অবস্থায় রয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তারা দিশেহারা। মরদেহ দেশে আনতেও বিপুল অর্থের প্রয়োজন, যা তাদের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে তার ছোট ছোট তিনটি মেয়ে সরকারের কাছে আকুতি জানিয়েছে।

এদিকে খোকনের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বৃদ্ধা মা জরিনা বেগম বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। ছেলের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, এখন শেষবারের মতো তার মুখটা দেখতে পারব কি না জানি না। সরকারের কাছে আমার একটাই আবেদন, আমার ছেলের মরদেহ যেন দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়।

বাবার মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বড় মেয়ে জেরিন আক্তার বলেন, আমি শুধু চাই, বাবাকে শেষবারের মতো একবার দেখতে। বাবার মরদেহটা প্রধানমন্ত্রী যেন দেশে আনার ব্যবস্থা করে দেন।

স্বজনরা জানান, ইতালি থেকে খোকনের মরদেহ দেশে আনতে প্রায় ৭ লাখ টাকা প্রয়োজন। কিন্তু দরিদ্র পরিবারটির পক্ষে সেই টাকা জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রিয়জনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়েও চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে পরিবারের। এমন পরিস্থিতে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সমাজের বিত্তবান মানুষের প্রতি মানবিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে পরিবারটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights