ইরান যুদ্ধে কে হেরেছে, জিতল কে: রয়টার্সের বিশ্লেষণ

অনলাইন ডেস্ক

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যৌথভাবে হামলা চালায় ‍যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তৎক্ষণাৎ পাল্টা হামলা শুরু করে ইরানও। ওই দিন থেকেই ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান, যা এখনও অব্যাহত।

তবে এই যুদ্ধ এখন আর কেবল সামরিক ঘাঁটি কিংবা লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি উৎপাদনের হৃৎপিণ্ডে আঘাত হেনেছে। সম্প্রতি ইরানে বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র সাউথ পারসে হামলা চালায় ইসরায়েল। পরবর্তীতে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন তেল ও গ্যাসক্ষেত্রে তেহরানের পাল্টা হামলা এই যুদ্ধকে এক নতুন ও বিপজ্জনক মাত্রায় নিয়ে গেছে। এতে এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই যুদ্ধে কে জয়ী এবং কে পরাজয়ী, তা নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ যদি আগামীকালই শেষ হয়, তবু একটি বিষয় এর আগেই স্পষ্ট হয়ে গেছে, তা হলো এই সংঘাতের পর আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবেন দখলদার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সামাল দিতে হবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা। আর সেই সঙ্গে উপসাগরীয় মিত্রদের ক্ষোভ। কেননা, এই মার্কিন–মিত্ররাই এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ইরান যুদ্ধ ইসরায়েলের রাজনীতির মানচিত্র বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পক্ষে নতুনভাবে সাজিয়েছে। গাজা থেকে মনোযোগ সরিয়ে এখন তা কেন্দ্রীভূত হয়েছে ইরানের দিকে। আর ইরান প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য সবচেয়ে বেশি আর এখানে নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে নেতানিয়াহুর অবস্থান সবচেয়ে শক্তিশালী।

অন্যদিকে ট্রাম্পের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। তিনি এমন এক সংঘাতে আটকে পড়েছেন, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার স্পষ্ট কোনও পথ নেই। একই সঙ্গে এতে তার উপসাগরীয় আরব মিত্ররা ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিতে পড়েছে এবং তার অর্থনৈতিক সাফল্যের কথাবার্তাও প্রচণ্ডভাবে ধাক্কা খেয়েছে।

মার্কিন মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ের সাবেক মধ্যস্থতাকারী অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, এখানে স্পষ্টভাবে একজন বিজয়ী এবং একজন পরাজিত আছেন। নেতানিয়াহু নিঃসন্দেহে প্রধান বিজয়ী। তিনি ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা দেখাতে পেরেছেন। আর সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো।

মিলারের মতে, ট্রাম্পের সামনে এমন কোনও সহজ পথ নেই, যার মাধ্যমে তিনি বিজয় ঘোষণা করে এ পরিস্থিতি থেকে সরে আসতে পারেন।

ইরান বিশেষজ্ঞ করিম সাদজাদপুর বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবি করেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন ভেনেজুয়েলার মতো ডেলসি রড্রিগেজের মতো কোনও একজন ইরানি অনুগত ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্ব পাবেন। কিন্তু বাস্তবে পেয়েছেন উত্তর কোরিয়ার কিম জং–উনের মতো দৃঢ় প্রতিরোধ।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের নাতান স্যাকস বলেন, ইসরায়েলে এই যুদ্ধকে পছন্দের যুদ্ধ নয়, বরং প্রয়োজনের যুদ্ধ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, শাসনব্যবস্থার পতন না হলেও ইরান এবং তাদের নেতৃত্বাধীন মিলিশিয়া জোটকে দুর্বল করা নেতানিয়াহুর জন্য বড় লক্ষ্য।

কঠিন সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের সামনে

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আকাশযুদ্ধে দায়িত্ব ভাগাভাগি করা হয়েছে। ইসরায়েল পশ্চিম ও উত্তর ইরানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। আর যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে, ইরানের নৌ সক্ষমতা দুর্বল করতে হামলা পরিচালনা করছে।

দখলদার ইসরায়েল ইতোমধ্যে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর হামলা চালিয়েছে এবং অনেককে হত্যা করেছে। এর মধ্যে নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি ও গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খাতিব রয়েছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেন, নেতানিয়াহু ও তিনি সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন- যেকোনও উচ্চপদস্থ ইরানি কর্মকর্তাকে শনাক্ত করতে পারলেই হামলা চালানো যাবে।

তবে এসব সাফল্য যুদ্ধের সমাপ্তি টানতে পারেনি। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সামনে তিনটি কঠিন পথ রয়েছে: হামলা চালিয়ে যাওয়া, বিজয় ঘোষণা করে আশা করা যে, তেহরান পিছিয়ে যাবে, অথবা বড় আকারে সংঘাত বাড়ানো- কিন্তু কোনওটিই সহজ সমাধান নয়।

মার্কিন গোয়েন্দা প্রধান তুলসি গ্যাবার্ড কংগ্রেসকে জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর পর ইরান দুর্বল হলেও তাদের সরকার এখনও টিকে আছে এবং তারা এখনও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও মিত্রদের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।

বাড়ছে চাপ উপসাগরে

ট্রাম্পের হিসাব-নিকাশের ভুল এখন সবচেয়ে বেশি প্রতিফলিত হচ্ছে উপসাগরীয় অঞ্চলে। ইরান যখন বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে এবং বৈশ্বিক তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের পথ হরমুজ প্রণালি ব্যাহত করছে, তখন এই অঞ্চলের দেশগুলোই সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়ছে।

মিলার বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন যে হুমকি অনুভব করছে, তা তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। এই অঞ্চল ভবিষ্যতের কেন্দ্র হবে—এই ধারণাটাই এখন ঝুঁকির মুখে।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঝুঁকি- দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে অস্থিরতা থাকলে ইসরায়েলের জন্য সেটা মোটেও অস্বস্তিকর নয়। কারণ, তারা মনে করে এর আঞ্চলিক প্রভাব তাদের ওপর তুলনামূলক কম পড়বে-বিশেষ করে হামাস ও হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে যাওয়ার পর।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের উপসাগরীয় অংশীদারেরা জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলার ঝুঁকিতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এতে তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক পরিবহন ব্যাহত করছে।

ইসরায়েলের সাবেক সামরিক কৌশলপ্রধান আসাফ ওরিয়ন বলেন, আঞ্চলিক দেশগুলো ভাবছে ইসরায়েল কি ইরানে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে চায়। কারণ, এই অস্থিরতার প্রভাব তাদের ওপর বেশি পড়বে, ইসরায়েলের ওপর কম।

মূলত দুই মিত্রের ঝুঁকি–দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন: ইসরায়েলের কাছে ইরান একটি অস্তিত্বগত হুমকি, আর যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ এড়িয়ে অর্থনৈতিক ক্ষতি ও জোটের ভাঙন ঠেকাতে বেশি আগ্রহী।

যুদ্ধের মধ্যেও ইসরায়েলের বাজারে উল্লাস

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ইসরায়েলে জনসমর্থন পেলেও তা এখনও নির্বাচনী সমর্থনে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। জরিপে দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহুর জোট সংসদের ১২০ আসনের মধ্যে প্রায় ৫০টি আসন পেতে পারে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিচে।

তবে শেয়ারবাজারের উত্থান ও শেকেলের শক্তিশালী অবস্থান আপাত আত্মবিশ্বাসের চিত্র তুলে ধরছে, যদিও এর আড়ালে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

নেতানিয়াহুর সাবেক উপদেষ্টা আভিভ বুশিনস্কি বলেন, শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধকে দুইভাবে মূল্যায়ন করা হবে: ইরানের শাসনব্যবস্থা টিকে থাকল কি না। এর কম কিছু হলে সামরিক সাফল্য রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠতে পারে।

যদি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থা টিকে যায়- যদিও দুর্বল অবস্থায়- তাহলে বিজয়ের গল্প বদলে গিয়ে অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়ার সমালোচনা সামনে আসতে পারে। তখন গাজায় হামাস ও লেবাননে হিজবুল্লাহ থেকে আসা পুরোনো হুমকিগুলোও আবার সামনে চলে আসবে।

ইসরায়েলের বাজার হয়তো স্থিতিশীলতার আভাস দিচ্ছে, কিন্তু অসমাপ্ত যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য এখনও পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। সূত্র: রয়টার্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights