ইরান যুদ্ধের মধ্যেই মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরে চরম বিশৃঙ্খলা

অনলাইন ডেস্ক

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। দেশের ভেতরে নেতৃত্বের সংকট এবং বিদেশে সামরিক সক্ষমতার ওপর বাড়তে থাকা চাপ—দুইয়ের সমন্বয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। বুধবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর ছয় মাসের মাথায় মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, যখন সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত কমে এসেছে এবং মন্ত্রীর জবাবদিহিতার মাত্রা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সামরিক নেতৃত্বে সর্বশেষ বড় পদত্যাগের ঘটনা ঘটে সোমবার। ওই দিন আর্মি সেক্রেটারি ড্যান ড্রিসকল পদত্যাগ করেন। ট্রাম্প প্রশাসনের উদীয়মান তারকা হিসেবে বিবেচিত ড্রিসকলকে ইউক্রেন-সংক্রান্ত সংবেদনশীল কূটনৈতিক দায়িত্বের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল। তবে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব ও আধুনিকায়ন নিয়ে হেগসেথের সঙ্গে কয়েক মাসের মতবিরোধের পর তিনি পদ ছাড়েন।

এর আগে সেনাপ্রধান জেনারেল র‍্যান্ডি জর্জকে হেগসেথ বরখাস্ত করেন। ড্রিসকলের পদত্যাগের ফলে ইরান যুদ্ধের মধ্যেই সেনাবাহিনী সিনেট-অনুমোদিত বেসামরিক বা সামরিক নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। হেগসেথ এরই মধ্যে প্রায় সব বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বরখাস্ত বা পদচ্যুত করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন জয়েন্ট চিফসের চেয়ারম্যান, নৌবাহিনীর শীর্ষ অ্যাডমিরাল এবং সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ।

ওয়াশিংটন পোস্টের হিসাবে, হেগসেথের দায়িত্ব গ্রহণের পর পেন্টাগনের দুই ডজনের বেশি শীর্ষ কর্মকর্তা বরখাস্ত হয়েছেন। তিনি প্রায় পুরো জয়েন্ট চিফসকেই নতুন করে সাজিয়েছেন। তার অধীন থাকা মেরিন কোর ও স্পেস ফোর্সের প্রধানরাই কেবল এখনো নিজ নিজ পদে বহাল রয়েছেন।

এদিকে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, চলতি বছর পদোন্নতির তালিকা থেকে হেগসেথ ব্যক্তিগতভাবে অন্তত ৪৫ জন কর্মকর্তার নাম বাদ দিয়েছেন। ঐতিহ্যগতভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সরাসরি হস্তক্ষেপ থেকে দূরে থাকা পদোন্নতি ব্যবস্থায় এটিকে ব্যতিক্রমী হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এনবিসি নিউজ মঙ্গলবার জানায়, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতেও হেগসেথ আরও কয়েকটি পদোন্নতি আটকে দিয়েছেন। এসব কর্মকর্তার মধ্যে বিভিন্ন বাহিনীর এক ডজনের বেশি কৃষ্ণাঙ্গ, হিস্পানিক ও নারী কর্মকর্তা রয়েছেন। এর ফলে ইরান যুদ্ধের সময় মার্কিন সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কমান্ড কাঠামো আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ওয়াশিংটন পোস্টের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপ, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও লাতিন আমেরিকার দায়িত্বে থাকা কমান্ডাররা ইরান যুদ্ধের জন্য সেনা মোতায়েন বাড়ানোর বিষয়ে নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তার কাছে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের কারণে অন্যান্য অঞ্চলের হুমকি মোকাবিলায় মার্কিন সামরিক সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

হেগসেথকে নৌবাহিনীর শীর্ষ অ্যাডমিরাল জানিয়েছেন, তাদের ডেস্ট্রয়ারগুলোর মাত্র এক-চতুর্থাংশ মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। একই সঙ্গে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র বিশেষায়িত বিমানবাহী রণতরীও মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর মজুতের ৬৫ শতাংশ ব্যবহৃত হয়েছে। এতে ন্যাটোর সরবরাহেও চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে—এমন অস্ত্রও পেন্টাগনকে বর্তমান সংঘাতে ব্যবহার করতে হচ্ছে।

এক সাবেক সেনা কর্মকর্তা বলেন, প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা রয়েছে এবং সামরিক শিল্পের সঙ্গে কাজ করে সেই সক্ষমতাকে কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারেন—এমন গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের থাকা অত্যন্ত জরুরি। তার ভাষায়, ‘খেয়ালখুশিমতো এই লোকগুলোকে বরখাস্ত’ করলে বিভ্রান্তি ও শূন্যতা তৈরি হয়। তার মতে, মার্কিন সেনাবাহিনী বর্তমানে এমনই এক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

তবে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক বিবৃতিতে দপ্তরটি বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে—এমন ধারণাকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, এ ধরনের ধারণা পেন্টাগনের প্রত্যেক নিবেদিতপ্রাণ পেশাদার ও যোদ্ধার জন্য অপমানজনক, যারা প্রতিদিন দেশ রক্ষায় কাজ করতে আসেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights