ইরানের ‌‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট’ পেতে ট্রাম্প এতো মরিয়া কেন?

অনলাইন ডেস্ক
ইরানের বহুল আলোচিত ‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট’ (পারমাণবিক ধূলিকণা) নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তেহরান তাদের কাছে থাকা উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বা তার অবশিষ্টাংশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে রাজি হয়েছে।

গত বছর ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন বিমান হামলার পর থেকে এই পারমাণবিক উপাদানগুলো মাটির গভীরে চাপা পড়ে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) মনে করছে, এই তেজস্ক্রিয় ধ্বংসাবশেষগুলো উদ্ধার করা গেলে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার বক্তব্যে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়েছেন, ইরানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কোনো সুযোগ আর রাখা হবে না। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, মার্কিন বি-টু বোম্বার দিয়ে মাটির গভীরে গুঁড়িয়ে দেওয়া সেই পারমাণবিক ধূলিকণাগুলো খনন করে সরিয়ে ফেলতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাথে কাজ করবে। যদিও ইরানের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সম্মতি বা চুক্তির খবর পাওয়া যায়নি। তবুও পাকিস্তান ও আমেরিকার মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এই আলোচনা এগোচ্ছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। যদি এই প্রক্রিয়া সফল হয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নিরস্ত্রীকরণ প্রচেষ্টার একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে।

গত বছরের জুন মাসে আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার আগে ইরানের কাছে বিপুল পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত ছিল বলে জানা যায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তখন ইরানের ভাণ্ডারে অন্তত ৪০০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং প্রায় ২০০ কেজি ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পরিমাণ জ্বালানি দিয়ে খুব সহজেই ৯৫ শতাংশ বা অস্ত্র তৈরির উপযোগী পরমাণু বোমা তৈরি করা সম্ভব।

ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের এই কার্যক্রম কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কিন্তু বৈশ্বিক তথ্য-উপাত্ত এবং তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের উচ্চ হার বারবার ভিন্ন কিছুরই ইঙ্গিত দিয়েছে।

ইরান ২০৪১ সালের মধ্যে ২০ গিগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও বর্তমানে তাদের হাতে কেবল বুশেহর নামক একটি কার্যকর বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মিত এই কেন্দ্রটি ইরানের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার মাত্র এক শতাংশ মেটাতে সক্ষম। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলের খনি সমৃদ্ধ দেশ হওয়ায় তাদের জন্য পারমাণবিক বিদ্যুতের চেয়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেক বেশি সাশ্রয়ী। ফলে বিশাল ঘাটতি মেটানোর অজুহাতে ইরানের এই ব্যাপক ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকে পশ্চিমা বিশ্ব তাদের গোপন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উচ্চাকাঙ্ক্ষা হিসেবেই দেখে আসছে।

ইরানের অধিকাংশ পারমাণবিক জ্বালানি (নিউক্লিয়ার ডাস্ট) ইসফাহান এবং নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রের মাটির নিচে সুড়ঙ্গ পথে চাপা পড়ে আছে বলে আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসি জানিয়েছেন। যদিও গত বছরের হামলায় অনেক সেন্ট্রিফিউজ ধ্বংস হয়ে গেছে, তবুও তেহরানের কাছে বিকল্প উপায়ে নতুন স্থাপনা তৈরির সক্ষমতা রয়েছে বলে গোয়েন্দা রিপোর্টে উঠে এসেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইরান যদি সত্যিই তাদের বিদ্যমান ইউরেনিয়াম মজুত মার্কিন হাতে তুলে দিতে রাজি হয়, তবে তা হবে একটি বিশাল কৌশলগত ছাড়। তবে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি নির্মূল করা যাবে কি না, তা নিয়ে এখনো বিশ্বজুড়ে বিতর্ক ও সংশয় রয়ে গেছে।

সূত্র: এনডিটিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights