ইসলামে বান্দার হক ও আল্লাহর হক আদায়

আবদুর রশিদ

ইসলাম মানবাধিকারের সীমাকে এত প্রশস্ত করেছে যে পুরো জীবন এর মাঝে এসে পড়ে। পিতা-মাতার হক, বন্ধুবান্ধবের হক, শ্রমিক-মালিক এবং শাসক ও জনগণের হক, সরকারের হক, শ্রমজীবী মানুষদের হক, দুর্বল ও অসহায়দের হক, সাধারণ মানুষের হক ইত্যাদি। বলা যায়, বান্দার হক এবং আল্লাহর হক আদায় করার নামই হচ্ছে ইসলাম।

ইসলাম মানুষকে অধিকার আদায়ের চেয়ে অধিকার প্রদানের বিষয়ে বেশি উৎসাহিত করেছে। ইসলাম প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে গুরুত্বের সঙ্গে অন্যের হক ও অধিকার আদায়ের অনুভূতি জাগ্রত করে। কারণ কেয়ামতের দিন এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।

ইসলামই মানবজাতির জন্য প্রথম স্পষ্টভাবে মৌলিক অধিকার প্রদান করেছে। মানবজাতির মৌলিক অধিকারকেই মানবাধিকার বলে। ইসলামে যে মানবাধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তা স্বয়ং আল্লাহতায়ালা তাঁর বান্দাকে প্রদান করেছেন। পৃথিবীর কেউ তা রহিত করার অধিকার রাখে না। এ অধিকার কখনো রহিত হওয়ার নয়।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আমি মানুষকে সর্বশ্রেষ্ঠ ও চমৎকার অবয়বে সৃষ্টি করেছি (সুরা আততিন : ০৩)।’

আরও বলা হয়েছে, ‘তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে বাছাই করা হয়েছে, মানবের কল্যাণের জন্য (সুরা আলে ইমরান : ১১০)।’

মানুষে মানুষে সাম্যের ধারণা অন্য আয়াতে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মানুষ, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক নর ও নারী হতে (সুরা হুজরাত : ১৩)।’

ইসলামের শান্তির বাণী শুধু নিজ ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং পরমত ও পরধর্মের প্রতি সহনশীলতা ও সহানুভূতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে সম্প্রীতি ও ঐক্যে গুরুত্ব দেন হিজরি ৬২৪ সালের ‘মদিনা সনদ’ মানবাধিকারের জন্য বিখ্যাত।

আধুনিক যুগে প্রতিটি দেশ, জাতি ও সমাজে মানুষের মৌলিক অধিকার তথা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা এবং চিকিৎসার অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে রসুল (সা.) এর ওপর অবতীর্ণ ঐশী গ্রন্থ আল কোরআনে এসব মৌলিক অধিকার সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য এসেছে। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ। মানুষের কর্তব্য রিজিক অন্বেষণ করা। রাষ্ট্র বা সমাজপতিদের দায়িত্ব সে বিষয়ে সহযোগিতা করা।

মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় রসুল (সা.) এর কাছে নাজিলকৃত আল কোরআনে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট বিধান এসেছে। যেমন-

খাদ্য : পবিত্র কোরআনে ঘোষণা হচ্ছে, ‘পৃথিবীর প্রতিটি জীবের জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহ নিয়েছেন (সুরা হুদ ৬)।’

বস্ত্র : আল কোরআনের ঘোষণা : ‘হে বনি আদম, আমি তোমাদের জন্য পোশাক অবতীর্ণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে এবং অবতীর্ণ করেছি সাজসজ্জার বস্তু পরহেজগারির পোশাক। এটি উত্তম (সুরা আরাফ : ২৬)।’

বাসস্থান : মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার বাসস্থান। আল কোরআনের ঘোষণা : ‘আল্লাহ ঘোষণা করে দিয়েছেন তোমাদের ঘরকে অবস্থানের জায়গা এবং চতুষ্পদ জন্তুর চামড়া দ্বারা করেছেন তোমাদের জন্য তাঁবুর ব্যবস্থা (সুরা আন নাহল : ৮০)।’

অন্য আয়াতে এসেছে, ‘আমি কি তোমাদের জন্য জমিনকে বিছানা করিনি? (সুরা নাবা ৬)।’

শিক্ষা : কোরআনুল করিমের ঘোষণা : ‘পড় তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন (সুরা আলাক : ১-২)।’

চিকিৎসা : আল কোরআনে এসেছে, ‘আমি কোরআনে এমন বিষয় নাজিল করি, যা রোগের জন্য ওষুধ ও মুমিনের জন্য রহমত (সুরা বনি ইসরাইল : ৮২)।’

রসুল (সা.) মানুষের সুচিকিৎসায় উৎসাহিত করেছেন এবং উন্নত চিকিৎসার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেন, ‘তোমরা জয়তুনের তেল ব্যবহার কর, কেননা এটা কল্যাণকর বৃক্ষ।

রসুল (সা.) আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি মাসে তিন দিন সকালে মধু খাবে তার কোনো কঠিন ব্যাধি হবে না (ইবনে মাজাহ)।’ এমনিভাবে তিনি চিকিৎসার জন্য প্রাকৃতিক অনেক বস্তু যেমন আদা, কালিজিরা, খেজুর, দুধ ইত্যাদির উপকারিতা বর্ণনা করেছেন।

নারীর কল্যাণ : আইয়ামে জাহেলিয়ায় কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করলে একে দুর্ভাগ্যের কারণ মনে করে কখনো কখনো হত্যা বা জীবন্ত মাটি চাপা দেওয়া হতো! কিন্তু রসুল (সা.) স্পষ্ট ঘোষণা দিলেন, কন্যাসন্তান দুর্ভাগ্যের নয় বরং সৌভাগ্যের। তাদের হত্যা করা যাবে না, অভাব-অনটন থাকা সত্ত্বেও কন্যাসন্তানকে উত্তমরূপে লালনপালন করলে তারা তার জন্য জাহান্নামের পথে আড়াল হয়ে (পিতা-মাতাকে) রক্ষা করবে (বুখারি ও মুসলিম, মিশকাত)।

সামাজিক কল্যাণ : বিরাজমান ভেদাভেদ, পারস্পরিক বিদ্বেষ ও কলহকে চিরতরে দূরীভূত করার জন্য রসুল (সা.) সর্বোৎকৃষ্ট ভূমিকা রেখেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights