উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে শহর, পিছিয়ে গ্রাম

জয়শ্রী ভাদুড়ী

দেশে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি হলেও তা হচ্ছে অসমভাবে। শহরাঞ্চল ও সচ্ছল জনগোষ্ঠী কিছুটা এগিয়ে থাকলেও গ্রাম ও দরিদ্র মানুষের বড় অংশ এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সচেতনতা ও চিকিৎসা গ্রহণের হার বাড়লেও সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে ২০২২ সালেও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত প্রায় পাঁচজনের চারজনের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ছিল না। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। ২০১৭-১৮ ও ২০২২ সালের বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের তথ্য বিশ্লেষণ করে ২৭ হাজার ৪২৭ জন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর গবেষণাটি করা হয়। আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড জার্নাল ‘গ্লোবাল হার্ট’-এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের মধ্যে নিয়ন্ত্রণের হার ২০১৭-১৮ সালের ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে নিজের উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে জানার হার ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ৫৪ দশমিক ৩ শতাংশ এবং চিকিৎসা গ্রহণের হার ৩৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ সচেতনতা ও চিকিৎসা বাড়লেও কাক্সিক্ষত নিয়ন্ত্রণে পৌঁছানো যায়নি।

শহর-গ্রামের ব্যবধানও স্পষ্ট। ২০১৭-১৮ সালে শহরে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের হার ছিল ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ, গ্রামে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২২ সালে শহরে তা বেড়ে ২২ দশমিক ৬ শতাংশ হলেও গ্রামে হয়েছে ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ। একইভাবে দরিদ্রদের তুলনায় ধনী জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিয়ন্ত্রণের হার বেশি ছিল এবং সময়ের সঙ্গে আর্থসামাজিক বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিভাগভেদেও রয়েছে বড় পার্থক্য। সবচেয়ে বেশি উন্নতি হয়েছে সিলেটে-৭ দশমিক ৯ শতাংশ। সেখানে নিয়ন্ত্রণের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। বিপরীতে রাজশাহীতে উন্নতি মাত্র ৩ দশমিক ৮ শতাংশ; নিয়ন্ত্রণের হার ৭ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ হলেও দুই জরিপেই এটি সর্বনিম্ন। অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি হলেও তা সব শ্রেণি ও অঞ্চলে সমান নয়। দীর্ঘমেয়াদি এ রোগ নিয়ন্ত্রণে শুধু রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা শুরু করাই যথেষ্ট নয়; নিয়মিত ফলোআপ এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের ধারাবাহিক প্রাপ্যতাও নিশ্চিত করতে হবে।

সরকার ২০১৮ সালে বাংলাদেশ হাইপারটেনশন কন্ট্রোল ইনিশিয়েটিভ শুরু করে। বর্তমানে ৩২১টি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সাতটি জেলা সদর হাসপাতালে এনসিডি কর্নারের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপসহ অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে কার্যক্রম চলছে। তবে গবেষণার ফল বলছে, কর্মসূচির পাশাপাশি বিশেষ করে দরিদ্র ও গ্রামীণ মানুষের জন্য ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights