এআই আসলেই কি স্বাধীন সত্তা হয়ে মানব সভ্যতাকে গ্রাস করবে?
অনলাইন ডেস্ক
প্রযুক্তির এই রমরমা যুগে আমরা এমন এক অদ্ভুত আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যা আমাদের বাইরের চাকচিক্য নয়, বরং আমাদের ভেতরকার নৈতিক পতন, সাংস্কৃতিক অবক্ষয় এবং দীর্ঘদিনের অন্তসারশূন্যতাকে এক নিমেষে উন্মোচন করে দিচ্ছে। হ্যাঁ, আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর কথাই বলছি। এতদিন ধরে আমাদের মনে যে ভীতি কাজ করত; যে এআই একদিন স্বাধীন কোনো দানব হয়ে মানবজাতিকে গ্রাস করবে, মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে; রাশিয়ার বিখ্যাত ভালদাই ক্লাবের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক তিমোফেই বোর্দাচেভ তার এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে সেই ধারণাকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়েছেন।
তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো স্বাধীন মন বা সমাজবিচ্ছিন্ন কোনো মহাশক্তি নয়; এটি নিখাদ একটি আয়না। চাকা, মুদ্রণযন্ত্র, অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিন কিংবা পারমাণবিক চুল্লির মতো আবিষ্কারগুলো মানুষের সমাজ থেকে একসময় কিছুটা দূরে বা স্বাধীন মনে হলেও এআই কখনোই মানবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। এটি মানুষেরই জমা করা ভালো ও মন্দ চিন্তার এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। আমরা প্রতিদিন যে কোটি কোটি ডেটা, লেখা বা ছবি তৈরি করছি, এআই কেবল তারই ওপর ভিত্তি করে বিকশিত হচ্ছে। অর্থাৎ, মানুষই হলো এর চালিকাশক্তি। ফলে, প্রযুক্তি যতই অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগোক না কেন, মানুষের চিন্তা ও সংস্কৃতির বাইরে এর কোনো স্বাধীন সত্তা নেই।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চেও এই তত্ত্বটি সমানভাবে প্রযোজ্য। প্রযুক্তিগত অবকাঠামো বা এআই ডেটাসেন্টার কোনো দেশ এমনিতেই নিজের ওপর চাপিয়ে নেয় না, এর পেছনে কাজ করে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক আনুগত্য। উপসাগরীয় অঞ্চলের ধনী রাষ্ট্রগুলো যখন মার্কিন এআই অবকাঠামো লুফে নেয়, তখন বুঝতে হবে এটি মূলত আমেরিকার সঙ্গে তাদের পূর্বনির্ধারিত নিরাপত্তা ও সামরিক সম্পর্কেরই আরেকটি আধুনিক ডিজিটাল রূপ মাত্র। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের দেশগুলোর ক্ষেত্রেও একই নিয়ম খাটে; প্রথমে তারা রাজনৈতিকভাবে কার পক্ষে থাকবে তা ঠিক করে, আর তার পরেই নির্ধারিত হয় তাদের প্রযুক্তিগত নির্ভরতা কোথায় যাবে।
তবে আসল এবং সবচেয়ে ভয়ংকর বিপ্লবটি ঘটেছে অন্য এক জায়গায়। এআই আমাদের এমন কিছু সমস্যার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যা মানবসভ্যতা দশকের পর দশক ধরে ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিল। পারমাণবিক বোমা বা জেট ইঞ্জিন হয়তো আমাদের বিজ্ঞানের পরাক্রম দেখিয়েছিল, কিন্তু মানুষের নৈতিক দেউলিয়াত্ব বা অবক্ষয়কে তারা এভাবে আয়নার সামনে দাঁড় করাতে পারেনি। এআই আজ রূপ নিয়েছে মানবজাতির এক কৃত্রিম ‘যৌথ বিবেক’ হিসেবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া রাজনৈতিক কৃত্রিম কারসাজি, ক্লিকের নেশায় তৈরি ভুয়া ট্র্যাজেডি, বিভ্রান্তিকর ছবি এবং ইন্টারনেটের অন্তহীন আবর্জনা; যাকে আজ বলা হচ্ছে ‘এআই স্লপ’; তা আমাদের সংস্কৃতির দেউলিয়াত্বকে একেবারে নগ্ন করে দিয়েছে। শিক্ষা থেকে শুরু করে বিজ্ঞান ও সৃষ্টিশীলতার প্রতিটি শাখায় মানের যে ভয়াবহ পতন ঘটেছে, এআই কেবল তার ওপর থেকে পর্দা সরিয়ে দিয়েছে মাত্র।
ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রেও এআই গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইন্টারনেটের তথাকথিত স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার সমস্ত মোহ। আমেরিকা যখন প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব ধরে রাখতে মরিয়া, তখন বাকি বিশ্ব বুঝে গেছে যে ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব’ ছাড়া টিকে থাকা অসম্ভব। আর এই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই বিশ্ব রাজনীতিতে জন্ম নিচ্ছে এক নতুন প্রতিযোগী পরিবেশ। যেমনটি গত শতকে পারমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা মহাশক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি বড় ধরনের যুদ্ধ আটকে দিয়ে এক ধরনের ভীতিকর ভারসাম্য তৈরি করেছিল, তেমনি আজকের দিনে এআই-এর এই উপচে পড়া আবর্জনা ও প্রযুক্তির সংকট আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে যে আমাদের ভেতরের মূল্যবোধগুলো কীভাবে খণ্ডিত হয়ে গেছে।
কিন্তু তিমোফেই বোর্দাচেভের এই বিশ্লেষণে নিরাশার পাশাপাশি লুকিয়ে রয়েছে আশার এক ক্ষীণ আলোও। এআই আমাদের এই সংকট তৈরি করেনি, এটি কেবল আমাদের বহুদিনের এড়িয়ে যাওয়া সংকটকে এমন এক বিশাল পরিসরে দৃশ্যমান করেছে যা আর উপেক্ষা করার উপায় নেই। আর যখন কোনো গোপন রোগ স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে, তখনই কেবল তার সঠিক চিকিৎসার পথ উন্মুক্ত হয়। প্রযুক্তির এই নির্মম কিন্তু সত্যবাদী আয়না একদিন হয়তো মানবজাতিকে তার হারিয়ে যাওয়া নৈতিকতা ও সংস্কৃতির শিকড়ে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে; সমাজ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রতিটি স্তরে।
আরটির বিশ্লেষণ
