কঠিন শর্তের ঋণে সরকার

অনলাইন ডেস্ক

সরকারের নিজের আয় কম। রাজস্ব আয়ে ঘাটতি ছাড়িয়েছে লাখ কোটি টাকা। অথচ খরচ থেমে নেই। চলতি বাজেট বাস্তবায়নের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণ, জ্বালানি তেলে বাড়তি খরচসহ নানা কারণে কুলিয়ে উঠতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার।

এ ছাড়া বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক স্থবিরতার বোঝাও ঘাড়ে পড়েছে। ফলে সব দিক সামাল দিতে সরকারকে ধারকর্জ করতে হচ্ছে। তহবিল সংকট মোকাবেলায় দেশের ভেতর থেকে নেওয়া ঋণের বাইরেও কঠিন শর্তে, উচ্চ সুদে বিদেশি ঋণ নিচ্ছে সরকার। সাম্প্রতিক এক সিদ্ধান্তে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে মোট ১.৯ বিলিয়ন ডলারের পাঁচটি ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

যার মধ্যে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলারই ‘নন-কনসেশনাল’ বা অনমনীয় ঋণ। যেসব ঋণের সুদের হার বেশি, গ্রেস পিরিয়ড কম এবং শর্ত তুলনামূলক কঠোর। এতে স্বল্প মেয়াদে বাজেট ঘাটতি সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গত মঙ্গলবার শেরেবাংলানগরের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত নন-কনসেশনাল ঋণসংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভায় এসব ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অনুমোদিত ঋণের বড় অংশ প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা হিসেবে ব্যবহার করা হবে। মূলত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ এবং রাজস্ব ঘাটতির প্রেক্ষাপটে এই তহবিল তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেবে ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে সরকারের জন্য গলার কাঁটা হতে পারে।

এই বাজেট সহায়তা প্যাকেজে রয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার। এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে ২৫০ মিলিয়ন ডলার এবং ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ওএফআইডি) থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার।

তবে এসব ঋণের সুদের হার ৩ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে, যা প্রচলিত কনসেশনাল ঋণের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

এডিবির ‘স্ট্রেংদেনিং ইকোনমিক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড গভর্ন্যান্স’ কর্মসূচির আওতায় ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার অনমনীয় ঋণ হিসেবে দেওয়া হচ্ছে। এই অংশে সুদের হার প্রায় ৪.১৩ শতাংশ এবং গ্রান্ট এলিমেন্ট মাত্র ৬.৬১ শতাংশ, যা এটিকে ব্যয়বহুল ঋণ হিসেবে চিহ্নিত করে। একইভাবে এআইআইবির ঋণে সুদের হার প্রায় ৫.০৮ শতাংশ এবং গ্রান্ট এলিমেন্ট ঋণাত্মক, যা ঋণটিকে আরো কঠিন করে তুলেছে। জাইকার ঋণে সুদের হার তুলনামূলক কম হলেও সেটিও পুরোপুরি স্বল্পসুদী নয়।

বাজেট সহায়তার পাশাপাশি ঢাকা-সিলেট করিডর উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য এডিবির আরো ৩০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে। প্রায় ১৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পে মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা এবং সার্ভিস লেন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এখানেও ঋণের কার্যকর সুদের হার ৪ শতাংশের বেশি, যা ভবিষ্যতের দায় বাড়াবে।

এমন প্রেক্ষাপটে সরকার নীতিগতভাবে কিছু সীমা নির্ধারণ করেছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অনমনীয় বৈদেশিক ঋণের বার্ষিক পরিশোধ ব্যয় রপ্তানি আয়ের ১০ শতাংশ বা সরকারি রাজস্বের ১৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। পাশাপাশি মোট অনমনীয় ঋণের পরিমাণ জিডিপির ১০ শতাংশের নিচে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কেবল যেখানে কনসেশনাল ঋণ পাওয়া সম্ভব নয়, সেখানেই এ ধরনের ঋণ নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

তবে বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজেট সহায়তা ঋণের ওপর নির্ভরতা দ্রুত বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেকর্ড ৩.৪১ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা নেওয়া হয়েছে, যা দেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭৪.৩৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি। পাঁচ বছরে এই ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ৮.১১ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সহায়তা ছাড় হয়েছে, বিপরীতে ২.৬ বিলিয়ন ডলার আসল পরিশোধ করা হয়েছে। ফলে নিট ঋণ বেড়েই চলেছে। বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর অর্থ ছাড় বৃদ্ধি এবং বাজেট সহায়তা ঋণের উচ্চ প্রবাহ উভয়ই এই প্রবণতার পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলার সংকট সরকারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। এর ফলে উন্নয়ন প্রকল্পে নতুন ঋণ নেওয়ায় কিছুটা সংযম দেখালেও বাজেট সহায়তায় বড় অঙ্কের ঋণ নিতে হয়েছে।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এসব ঋণ মূলত বাণিজ্যিক সুদের ভিত্তিতে নেওয়া হয়, যা সাধারণত প্রায় ৫-৬ শতাংশের কাছাকাছি থাকে এবং অনেক বেশি ব্যয়বহুল। তাঁর মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ঋণ ব্যবহার করে যেসব অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলো থেকে পর্যাপ্ত আয় বা রিটার্ন আসছে কি না। কারণ যদি প্রকল্পগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন না পাওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও আইএমএফ থেকে রেকর্ড পরিমাণ বাজেট সহায়তা নেওয়া হয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ব্যালান্স অব পেমেন্টে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। দেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপও দ্রুত বাড়ছে। আগামী সময়ে ঋণ পরিশোধ ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। তাই এখন থেকেই ঋণ ব্যবস্থাপনায় আরো সতর্ক হতে হবে। তাঁর মতে, মেগা ঋণ এড়িয়ে চলা এবং কঠিন শর্তযুক্ত ঋণ গ্রহণে সংযম দেখানো জরুরি। কেবল সেই ঋণই নেওয়া উচিত, যেগুলো থেকে দ্রুত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া সম্ভব।

ইআরডির তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশকে মোট প্রায় ২৫.৯৯ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে ১৮.৩৮ বিলিয়ন ডলার আসল এবং ৭.৬ বিলিয়ন ডলার সুদ। ২০২৯-৩০ অর্থবছরকে সর্বোচ্চ চাপের বছর হিসেবে ধরা হয়েছে, যখন প্রায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে।

এদিকে, অনেক বড় প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে আসছে। ফলে আসল পরিশোধ শুরু হচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বেশ কয়েকটি প্রকল্পের কিস্তি আগামী বছরগুলোতে পরিশোধ শুরু হবে, যা সামগ্রিক ঋণচাপ আরো বাড়াবে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ও প্রত্যাশিত সুফল না পাওয়া পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় জরুরি ভিত্তিতে রপ্তানি আয় ও প্রবাস আয় বাড়ানো, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো প্রয়োজন। অন্যথায় উচ্চ সুদে নেওয়া বৈদেশিক ঋণ ভবিষ্যতে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।

সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights