করিতকর্মা প্রশাসন সাজাতে নজর সরকারের
ওয়াজেদ হীরা
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় লেজুড়বৃত্তিতে জড়িয়ে দলকানা পরিচিতি পায় প্রশাসন। গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রশাসনের আরও ভঙ্গুর ও নাজুক পরিস্থিতি হয়। একটা বিশেষ দলের লোকদের প্রাধান্য দিয়ে মেধাবীদের দলীয় ট্যাগ দিয়ে কোণঠাসা করা হয় গত ১৬ মাসে। সাবেক আমলারা মনে করছেন, একটা ভঙ্গুর প্রশাসনকে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড় করানো চ্যালেঞ্জ নতুন সরকারের সামনে। ইতোমধ্যেই নতুন করে প্রশাসন সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। বর্তমান সরকার কে কোন দল করে চাকরিতে এসেছে তা না দেখে মেধা ও দক্ষতা দেখতে চায়। একটি করিতকর্মা প্রশাসন সাজানো নিয়ে কাজ করছে সরকার।
সচিবালয়ে দেখা গেছে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিগত দিনের বঞ্চিত কর্মকর্তাদের তৎপরতা বেড়েছে। বিগত দিনের নিজেদের বঞ্ছনার কথা তুলে ধরতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব, বিভিন্ন দলীয় প্রভাবশালী নেতাদের কাছে যাচ্ছেন। অনেকে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি পেতে যোগাযোগ করছেন। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন সময় বঞ্চিত হয়ে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের কয়েকজনকে সচিব করে চাকরিতে ফেরানো হয়েছে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে। যদিও চুক্তি নিয়োগ নিয়ে প্রশাসনের ভিতরে চাপা কান্না বিরাজ করছে। সম্প্রতি ১২টি মন্ত্রণালয় বিভাগে নতুন সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ৫টি মন্ত্রণালয়/বিভাগ থেকে সচিব প্রত্যাহারও করা হয়েছে।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, শুরু থেকে প্রশাসনকে ঠিকভাবে সাজাতে না পারলে এর খেসারত দিতে হয় সরকারকে। গত ১৮ মাস ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার ছিল প্রশাসনিকভাবে পুরোটাই ব্যর্থ। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসনে সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক জায়গায় বসাতে না পারলে সরকারের এগিয়ে যাওয়া কঠিন হবে। প্রধানমন্ত্রীর যে কাজের স্পিড সে গতিতে কাজ করতে হবে সচিবদেরও। সুতরাং সেখানে বয়সও একটা ফ্যাক্টর।
সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আউয়াল মজুমদার বলেন, আমরা চাই প্রশাসন মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াক। তবে সেটা মুখে বললে হবে না। সরকার বা যাদের ওপর দক্ষ লোক খুঁজে বের করার কথা সেই জনপ্রশাসন উপদেষ্টা, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বা সচিবদের একাধিক মাধ্যমে তথ্য নিতে হবে। আশপাশের লোকের কান কথা শোনা যাবে না। একটি ভালো কর্মকর্তা পদায়ন করতে গেলে কখনো অযোগ্যরা কান কথা লাগায়। কখনো পিএস-এপিএসরাও এ কাজটি করে। সাবেক এই সচিব বলেন, শেখ হাসিনার ১৫ বছরে আমলাতন্ত্র একটা ছোট গ্রুপের কাছে বন্দি হয়েছিল। ওই গ্রুপের ওপর নির্ভর করে ভুলের খেসারত দিতে হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারও দুই উপদেষ্টা আর দু-তিনজন সচিবের খপ্পরে পড়েছিল। ফলে অনেক ভালো কাজ করার সুযোগ থাকলেও করতে পারেনি। আশা করি, বর্তমান সরকার কোনো ছোট আমলা গ্রুপের খপ্পরে পড়বেন না। চোখ-কান খোলা রাখবেন তাহলে একটা দক্ষ প্রশাসন হবে, কাজের গতি পাবে। আবার প্রশাসনের যোগ্যরাও ন্যায্যতা বঞ্চিত হবে না।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নতুন সরকার দক্ষ প্রশাসন গড়তে চায়। সততা ও দক্ষতাকে গুরুত্ব দিয়ে আগানো হচ্ছে। আমাদের কাছে রাজনৈতিক কোনো গুরুত্ব নেই। দলীয় পরিচয় নয় বরং কর্মকর্তাদের মধ্যে দক্ষতা সততা দেখতে চাই। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সব নাগরিককে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ সরকার সবার। সরকারি কর্মচারীদের কোনো দল নেই। প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিগত দিনে দলীয় ট্যাগ দিয়ে অনেকের ক্ষতি করেছে। অনেকে তাদের মেধা কাজে লাগাতে পারেনি। কে কোন দল করে চাকরিতে এসেছে, আগে কোন দলের পোস্ট ছিল সেটা বিবেচ্য নয়। আমরা দেখব সে কতটুকু দক্ষ, মেধাবী এবং সততার সঙ্গে কাজটি করছে।
জানা গেছে, সংস্থাপ্রধান, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের পরিবর্তন নিয়ে কাজ চলছে। জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পলিসি লেভেল এবং শীর্ষ পর্যায় নিয়ে আপাতত রদবদল করা হবে। প্রশাসন ক্যাডার থেকে বিদেশের মিশনগুলোতে যারা গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পোস্টিং পেয়েছিল তাদেরও ফেরানো হতে পারে। সেখানেও নতুন মুখ হিসেবে পদায়ন করা হবে। সূত্র জানায়, সরকারের নবযাত্রা হিসেবে রদবদলের প্রক্রিয়ায় একটু ধীরে যাচ্ছে। তবে ভিতরে ভিতের কেন্দ্রীয় প্রশাসন সাজানো কাজ চলছে। মাঠ প্রশাসনেও হাত দেবে সরকার। সে ক্ষেত্রে কয়েকজন ডিসি পরিবর্তন হয়ে নতুন ডিসি মাঠে যাবে। একটি সূত্র জানায়, জনপ্রশাসনে অন্তর্বর্তী সরকারের একটা গ্রুপ এখনো রয়ে গেছে। যারা ভালো কর্মকর্তাদের পদায়নে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। উপসচিব, যুগ্মসচিব, অতিরিক্ত সচিবদের মন্ত্রণালয় বা পদায়ন করতে গেলে তাদের পদায়ন ঠেকাতে নানা কুৎসা রটায়। অনেক সময় নামে-বেনামে নানা অভিযোগ উত্থাপন করেন প্রতিমন্ত্রী-সচিবদের সামনে। জনপ্রশাসনের এপিডি উইং সম্পূর্ণ দলীয়মুক্ত করার কথা বলেছেন সাবেক কর্মকর্তারা। সাবেক আমলার জানান, সচিবালয়ে অনেকে ৮-১০ বছর বা আরও বেশি সময় ঘুরে ফিরে এক-দুই মন্ত্রণালয়ে কাটিয়ে দিচ্ছে। অনেকে চাকরি জীবনে সচিবালয়ে পোস্টিং পাচ্ছে না। এটা ঠিক করা দরকার। যারা সচিবালয়ে ৫ বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করছেন এমন কর্মকর্তাদের উপসচিব, যুগ্মসচিব বাইরের প্রতিষ্ঠানে পাঠানো দরকার, অতিরিক্ত সচিবদের সুযোগ থাকলেও তাদেরও। আর বাইরে কাজ করাদের সচিবালয়ে কাজ করার সুযোগ দরকার। তাহলে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে মত সাবেক কর্মকর্তাদের।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একটি অভ্যুত্থানের পরও গত দেড় বছরে বেশি সময়ে গুণগত পরিবর্তন দেখা যায়নি বরং প্রশাসনে সর্বস্তরে একটা বিশেষ গ্রুপ প্রাধান্য পেয়েছিল। একাধিক অতিরিক্ত সচিব বলেন, এখনো সচিবালয়ের মতো জায়গায় বেশির ভাগ দলীয় মনোভাবে পোস্টিং হচ্ছে। আর ভালো দক্ষ কর্মকর্তাদের সচিবালয়ের বাইরে, ঢাকার বাইরে পোস্টিং বা ওএসডি কারণ তাদের তদবির নেই। একজন সচিব নাম প্রকাশ না করে বলেন, মন্ত্রী সচিবদের কানে আমাদের প্রশাসনের লোকজনই কুমন্ত্রণা দেন, ট্যাগ দেন। যে দল ক্ষমতায় থাকে বিরোধী দলের ট্যাগ দিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত একটা গ্রুপ সবসময়ই থাকে। নানা অজুহাতে আমরাই আমাদের ভালো কর্মকর্তাদের সামনে আসতে দিই না।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, একটা সময় ছিল দলীয় প্রশাসন। আর অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসনকে না সাজিয়ে আরও দুর্বল করে গেছে। মনোবল ভেঙে দিয়ে গেছে। প্রশাসনের সক্ষমতাকে একেবারে বিনষ্ট করে গেছে। দক্ষ প্রশাসন গড়তে সরকারকে পরামর্শ দিয়ে এ জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ বলেন, সবসময় সরকারের আশপাশে দুষ্টু চক্র গড়ে ওঠে। তারাই সরকারকে বেকায়দায় ফেলে। তাই আশপাশের লোক নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। আরেকটি হলো সরকার তার অনুগত লোক নিয়োগ দেবে এটা স্বাভাবিক তবে সে যেন দক্ষ হয় এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষ হয়। রাজনৈতিক কর্মীদের মতো যেন আচরণ না হয়। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারকে যেন সঠিক তথ্য দিতে পারে সে বিষয়ে সাহস থাকতে হবে। আর যারে-তারে নিয়োগ দিলে এ প্রশাসন সামাল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে যাবে।
