কালের আলোয় রবীন্দ্রনাথের প্রথম ও শেষতম ছোট গল্প

ডা. উজ্জ্বল কুমার রায়

আবার এসেছে বৈশাখ, সারা বৈশাখই এখন রবীন্দ্রময়।’বৈশাখ মানে রবির মাস / গান কবিতায় মেটে আশ’।
শুধু গান- কবিতা নয়, রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য ক্ষেত্রের বিভিন্ন লেখার সঙ্গে ছোট গল্পও আজ ভীষণ ভাবে প্রাসঙ্গিক। সেগুলো শুধু মনের খিদে মেটায় না, এই বর্তমান সময়েও বাস্তব জীবনের জলন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে আছে সেগুলো — ‘ ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা / ছোট ছোট দুঃখ কথা / নিতান্তই সহজ সরল ‘।জমিদারি দেখা শোনার কাজে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ গ্রাম বাংলার মানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশেছেন। সাধারণ মানুষের জীবনের সমস্যা, টানাপোড়েন, স্নেহ- ভালোবাসা, উত্থান- পতন, মর্যাদাবোধ — সব কিছুই ফুটে উঠেছে তাঁর ছোট গল্পে।কোনও সন্দেহ নেই, রবীন্দ্রনাথই ছোট গল্পের জনক।
রবীন্দ্রনাথ মোট ৯৫ টি ছোট গল্প লিখেছিলেন। তাঁর লেখা প্রথম ছোট গল্প ‘ ভিখারিনী ‘ ১২৮৪ সালে ভারতী পএিকায় প্রকাশিত হয়।তখন তাঁর বয়স ছিল মাএ ১৬। তবে রবীন্দ্রনাথের প্রথম সার্থক ছোট গল্প ‘ দেনাপাওনা’ প্রকাশিত হয় ১২৯৮ সালে ‘ হিতবাদী ‘ পএিকায়। রবীন্দ্রনাথের লেখা শেষ ছোট গল্প ” মুসলমানীর গল্প ” প্রকাশিত হয় ঋৃতুপএে, বর্ষা সংখ্যায়, ১৩৪৮ সালে। রবীন্দ্রনাথের লেখা প্রথম ছোট গল্পের সঙ্গে অনেক জায়গায় মিল রয়েছে। তবে রবীন্দ্রনাথ শেষবেলায় অনেকবেশি পরিনত, উদার, বাস্তববাদী,দায়িত্ববান,প্রগতিশীল ও মানবিক।প্রতম গল্পের নামকরণে নারীকেন্দ্রিকতা লক্ষ করা যায়,শেষ গল্পেও তাই।প্রথম গল্পের নায়িকা কমল। শেষ গল্পের নায়িকা কমলা।দুজনের ভাগ্যই দস্যু – বিড়ম্বিত। তবে দুজনের পরিণতি ভিন্ন। প্রথম গল্পের প্রকাশ বর্ষাকালে শ্রাবণ – ভাদ্র মাসে। শেষ গল্পও প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর কিছু আগে ১৩৪৮ সালের আষাঢ় মাসে।
প্রথম গল্প ভিখারিনীর প্রেক্ষাপট কাশ্মীর। নায়িকা কমল প্রেমিক অমরসিংহের সঙ্গে বিবাহের মনোরম স্বপ্নে বিভোর। অমরের যুদ্ধক্ষেএে গমন,কমলের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে।আর্থিক ভাবে বিপর্যস্ত কমল ও তার বিধবা মা ভিখারিনীতে পরিণত হয়।ভিক্ষাকালে অনাহারক্লিষ্ট কমল তুষার চাপা পড়ার হাত থেকে দস্যুদের দ্বারা রক্ষা পেলেও পণবন্দি হয়ে পড়ে। কমলের বিধবা মা ধনি মোহনলালের কাছে অর্থ সংগ্রহ করে এবং দস্যুদের প্রদান করে কমলকে ছাড়াতে সমর্থ হয়।শর্ত অনুযায়ী কমল মোহনকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিয়ে করতে বাধ্য হয়।কিন্তু কমলের মন অমরকে খুঁজে বেড়ায়।যুদ্ধক্ষেএ থেক ফিরে এসে অমর কমলের কাছে থেকে হৃদয় বিদারক ‘ ভাই অমর’ ডাক শুনতে পায়।জীবনের কোনও হিসেবই মেলে কমলের।’ ভিখারিনী ‘ কমলের মনোবিকলনের গল্প বলা যায়।আসা যাক শেষ গল্পটির কথায়।কবি তখন জীবন সায়াহ্নে উপনীত। অশক্ত, হাতে লেখার মতো শক্তি নেই। কিন্তু মন তো তখনও সজীব। কবি বলে চলেছেন আর শ্রুতি লিখনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন প্রতিমা ঠাকুর, রাণী চন্দরা। তাই খসড়া আকারে ঋৃতুপএে প্রকাশিত হল শেষ ছোট গল্প ‘ মুসলমানীর গল্প ‘। এর প্রায় মাসখানেক পরে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু ঘটেছিল। এই গল্পে তিনি জাতপাত ও ধর্মীয় ভেদাভেদের উর্ধ্বে উঠে মানবধর্ম বা জীবনের জয়গান গেয়েছেন। দেশ তখন ইংরেজদের অধীন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে।এই গল্পের পটভূমি বাংলা। হয়তো জমিদারতে ঘটা কোনও ঘটনা রবীন্দ্রনাথের এই গল্পের উৎস। বিয়ের পর স্বামী সঙ্গে ঘরে ফেরার পথে নববধূ কমলা রাএে ডাকাতদের হামলার সম্মুখীন হয়।বৃদ্ধ হাবিব খাঁ কমলাকে রক্ষা করে ও আশ্রয় দেয়। সেখানে ব্রাক্ষণ কন্যা কমলা হিন্দুর জীবনযাপন করে।কমলার কাকা সমাজবিচ্যুত হওয়ার ভয়ে ভাইঝিকে ঘরে না ফিরিয়ে পরিত্যাগ করে। যেই রাতে বিসর্জন সম্পন্ন হয়েছে। কমলা বুঝতে পারল, সমাজ কি নিষ্ঠুর, জাতপাত কি ভয়ংকর! হিন্দু সমাজ বিচ্যুত কমলা হাবিব খাঁর আশ্রয়ে হিন্দু আচার – বিচারের মধ্যেই বড় হতে লাগল। যৌবনের অনিবার্য পরিণতিতে হাবিব খাঁর মেঝ ছেলে করিমের সঙ্গে তার ভালোবাসা তৈরি হল।তখন তাঁর উপলব্ধি —-‘ আমার ধর্ম নেই, আমি যাকে ভালোবাসি সেই ভাগ্যবানই আমার ধর্ম।…..যে দেবতা আমাকে আশ্রয় সেই ভালোবাসার সন্মানের মধ্যে তাকে আমি পূজো করি।তিনিই আমার দেবতা — তিনি হিন্দুও নন,তিনি মুসলমানও নন ‘। বিয়ের পর কমলা নতুন জীবন লাভ করে।পরিচিত হয় মেহেরজান নামে।কমলার কথারই প্রতিধ্বনি —‘ আমার না হয় দুই ধর্মই থাকল ‘। কথায় আছে History repeats itself —- কমলার কাকার দ্বিতীয় মেয়ের বিয়েতেও একই ঘটনা ঘটল। স্বামীগৃহে যাএাপথে ডাকাতদের আক্রমণের মুখে পড়ল কনে। তখন এই কমলা তথা মেহেরজানই ডাকাতদের হাত থেকে বাঁচাল তার বোনকে। জাতপাতের উর্ধ্বে উঠে রবীন্দ্রনাথের শেষ ছোট গল্প ” মুসলমানীর গল্প ” শেষ হয়েছে জীবনের জয়গানে —” আমার বোন” যদি দুঃখে পড়ে তবে তার মনে থাকে যেন তার মুসলমান দিদি আছে তাকে রক্ষা করার জন্য। ‘ ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়েছে তাও ৭৪ বছর আগে।সেটা ভেঙে পাকিস্তান – বাংলাদেশও হয়েছে। কিন্তু এখনও সমাজ দস্যুতা, জাতপাত, অসহিষ্ণুতা ও ধর্মীয় ভেদাভেদ থেকে মুক্ত নয়।নারীরাও হয় অসম্মানিত। ২৫ বৈশাখের জন্মক্ষণে রবীন্দ্রনাথের প্রথম ছোট গল্প ” ভিখারিনী ” ও শেষ ছোট গল্প ” মুসলমানীর গল্প’র তুলনামূলক আলোচনার প্রাসঙ্গিকতাও তাই অনস্বীকার্য।
লেখকঃ মিডিয়া ব্যক্তিত্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights