কালের বিবর্তনে বিলুপ্তির পথে কৃষকদের সেই গোলাঘর

আব্দুস সালাম, দিনাজপুর প্রতিনিধি ঃ

গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ- এটি গ্রাম বাংলায় প্রচলিত একটি প্রবাদ। বর্তমান সময়ে পুকুর ভরা মাছ থাকলেও নেই কেবল গোলাভরা ধান। কালের বিবর্তনে বিলুপ্তির পথে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য কৃষকদের ধান রাখার সেই গোলাঘর।

শস্য ভান্ডারখ্যাত দেশের বৃহত্তর দিনাজপুর জেলা। এই জেলা ১৩ টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। দিনাজপুর জেলার প্রাচীন ঐতিহ্য ধানের গোলা আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। এ অঞ্চলের কৃষকের ধান রাখার জন্য ধানের গোলা তেমন আর চোখে পড়ে না। আগে কৃষক বলতে গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ ও গোলা ভরা ধান এখন প্রবাদ বাক্যে পরিণত হতে চলেছে। অতীতে গ্রামবাংলার সমৃদ্ধির প্রতীক ধানের গোলা এখন বিলুপ্ত প্রায়।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে কৃষিক্ষেত ও কৃষকের ঐতিহ্যবাহী ধানের গোলা। অতীতে গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ কৃষকের বাড়িতে ধান মজুদ রাখার জন্য বাঁশ, বেত ও কাদা দিয়ে তৈরি করা হতো গোলাঘর। এর পর তার গায়ে ভিতরে ও বাহিরে বেশ পুরু করে মাটির আস্তারণ লাগানো হত। চোরের ভয়ে এর মুখ বা প্রবেশ পথ রাখা হত বেশ উপরে।এক সময়ে সমাজের নেতৃত্ব নির্ভর করত কার কয়টি ধানের গোলা আছে এই হিসেব কষে। শুধু তাই নয় কন্যা ও বর পক্ষের বাড়ির ধানের গোলার খবর নিতো উভয় পক্ষের লোকজন। যা এখন শুধু কল্পকাহিনী।

গোলাঘর দেখা যেত অনেক দূর থেকে। জানা গেছে, একটি গোলাঘর তৈরি করতে খরচ হতো ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। প্রতি বছর ধান কাটার মৌসুমে কৃষাণিরা গোলাঘর লেপে (মাটির আস্তর) প্রস্তুত করে রাখতো। আগের দিনে গোলাঘর দেখে অনুমান করা যেতো এলাকায় কে কত বড় জোতদার। গোলা ঘরের বদলে মানুষ এখন চট ও প্লাস্টিকের বস্তায় ধান ভরে ঘরে মজুদ রাখছেন।গোলা নির্মাণ করার জন্য বিভিন্ন এলাকায় আগে দক্ষ শ্রমিক ছিল। এখন আর দেশের বিভিন্ন জেলা শহর থেকে আসা গোলা নির্মাণ শ্রমিকদের দেখা মেলে না। তারা বাড়িতে এসে বাঁশ দিয়ে তৈরি করত ধানের গোলা। কাজ না থাকায় এখন তারা ভিন্ন পেশা বেছে নিয়েছে।এই গোলা ছিল সমভ্রান্ত কৃষক পরিবারের ঐতিহ্য। সে সময় ভাদ্র মাসে কাদা পানিতে ধান শুকাতে না পেরে কৃষকরা ভেজা আউশ ধান রেখে দিতো গোলা ভর্তি করে।

গোলায় শুকানো ভেজা ধানের চাল হত শক্ত। কিন্তু সম্প্রতি রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও আধুনিক কলের লাঙ্গল যেন উল্টে পাল্টে দিয়েছে গ্রাম অঞ্চলের চালচিত্র। গোলায় তোলার মত ধান আর তাদের থাকে না। গোলার পরিবর্তে কৃষকরা ধান রাখা শুরু করেছে আধুনিক গুদামঘরে। নতুন প্রজন্মের কাছে গোলাঘর একটি স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে।

দিনাজপুর সদর উপজেলার পশ্চিম শীবরামপুর গ্রামের ইকবাল জানান, গোলাঘর একটি পুরোনো ঐতিহ্য এটা আমার দাদার স্মৃতি এটা ১০০ বছরের পুরোনো আমার বাবা ব্যবহার করতো তার পর বর্তমানে আমি ব্যবহার কি এই গোলাঘর প্রায় (হারিয়ে) গেছে। একই গ্রামের অপর একজন বয়োবৃদ্ধ নূর জাহান বলেন, আগে আমরা কাজ শেষে একটু আরাম করতাম । এখন ঠান্ডা নাগাইনা (এসি) ঘর বানিয়ে তালা দিয়া রাখি।বাস্তবতা বড়ই নিষ্ঠুর।

তারা জানান, আগের দিনে ধান রাখার জন্য গোলাঘর ব্যবহার করা হতো। গোলাঘরে ধান রাখায় ইঁদুর ও পোকামাকড়ের উৎপাত থেকে ফসল রক্ষা পেতো। একটি বড় গোলা ঘরে সাধারণত ২-৩শ’ মণ পর্যন্ত ধান রাখা যেতো। উপজেলার কয়েকটি বসত বাড়ির আঙ্গিনায় এখনো দেখা মেলে গোলাঘরের। তবে এতে এখন আর ধান রাখা হয় না। গ্রাম-বাংলার এ ঐতিহ্যটুকু শুধুই স্মৃতি হিসেবে রেখে দিয়েছেন তারা।

আগামী প্রজন্মের কাছে গোলাঘর একটি স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। আধুনিক গুদাম ঘর ধানচাল রাখার জায়গা দখল করছে। ফলে গোলা ঘরের ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলা থেকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights