কুসংস্কারের কুয়াশা ও কোরআন-হাদিসের আলো

মুফতি রফিকুল ইসলাম আল মাদানি

মানুষের মন বড়ই বিচিত্র। যেখানে জ্ঞানের আলো পৌঁছায় না, সেখানে সে নিজেই কল্পনার প্রদীপ জ্বালিয়ে নেয়। আর সেই কল্পিত আলো কখনো কখনো পথ দেখানোর বদলে পথ হারিয়ে দেয়। ইসলাম-পূর্ব আরবের মরুভূমিতে, যেখানে জীবন ছিল অনিশ্চয়তায় ঘেরা, সেখানে এমনই এক কল্পনার জন্ম হয়েছিল-সফর মাস ঘিরে। আরবি বছরের দ্বিতীয় মাস এই সফর, জাহেলি যুগের মানুষের কাছে ছিল অশুভ, অকল্যাণকর, রোগব্যাধি ও দুর্ভাগ্যের প্রতীক।

কুসংস্কারের শিকড় : জাহেলি আরবরা বিশ্বাস করত, সফর মাসে বিয়ে করলে সংসারে অকল্যাণ নেমে আসে, ভ্রমণে বের হলে বিপদ ঘটে, আর এই মাসে জন্ম নেওয়া সন্তান দুর্ভাগ্যের বাহক হয়। কেউ কেউ মনে করত, সফর মাসেই সাপের পেটে এক বিশেষ কীট জন্মায় যা মানুষের ক্ষুধা-পীড়ার কারণ, তাই একে রোগের মাস বলেও গণ্য করা হতো। এই অন্ধ বিশ্বাসের জাল এতটাই গভীর ছিল যে, মানুষ প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম, নিজের কর্মফল আর আল্লাহর অকাট্য বিধান ভুলে একটি মাসের নামের মধ্যেই ভাগ্যের নিয়ন্তা খুঁজে বেড়াত। অথচ কোনো মাস, দিন বা অন্য কিছুই নিজে থেকে শুভ বা অশুভ হতে পারে না-এই সহজ সত্যটিই মানুষ ভুলে গিয়েছিল।

কোরআনের আলোকে শুভ অশুভ ও ভাগ্য : জীবনের প্রতিটি বাঁকে যা কিছু ঘটে, তার নিয়ন্তা একমাত্র আল্লাহ- এই বিশ্বাসই মুমিনের অন্তরে জন্ম দেয় এক অটুট প্রশান্তি। আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেন, ‘বলুন, আমাদের ওপর কেবল তা-ই আপতিত হবে, যা আল্লাহ আমাদের জন্য লিখে রেখেছেন। তিনিই আমাদের অভিভাবক। আর মুমিনদের উচিত আল্লাহর ওপরই তাওয়াক্কুল করা’ (সুরা আত-তওবা-৫১)।

এই একটি বাক্যেই যেন এক পাহাড়সম বোঝা নেমে যায় মুমিনের কাঁধ থেকে। জীবনের অনিশ্চয়তার সমুদ্রে সে ভাসমান নয়-বরং তার হাতে ধরা আছে ইমানের নোঙর। আল্লাহ আরও বলেন, ‘আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদই আপতিত হয় না। আর যে আল্লাহর প্রতি ইমান রাখে, তিনি তার হৃদয়কে সঠিক পথে পরিচালিত করেন’ (সুরা আত-তাগাবুন-১১)।

এই আয়াতগুলোর মর্মবাণী হলো, ভাগ্য নির্ধারিত হয় আল্লাহর ইচ্ছায়, কোনো মাসের নামে বা কুলক্ষণে নয়। মুমিনের কর্তব্য হলো তাওয়াক্কুল, অর্থাৎ কাজের পর ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া, ভয়ের বশে কল্পিত অশুভ শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করা নয়।

হাদিসের সুস্পষ্ট ঘোষণা : রসুলুল্লাহ (সা.) সব কুসংস্কারের মূলে আঘাত হেনেছেন এক অসাধারণ সংক্ষিপ্ত অথচ ব্যাপক অর্থবোধক বাক্যে। সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিসে তিনি স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, রোগের নিজস্ব সংক্রামক ক্ষমতা নেই, পাখি উড়িয়ে শুভ-অশুভ নির্ণয়ের কোনো ভিত্তি নেই, আর সফর মাস বলে কিছুই অশুভ নয়। এই তিনটি বিশ্বাসকেই তিনি একযোগে বাতিল ঘোষণা করেছেন। এ একটি বাক্যেই জাহেলি যুগের শত শত বছরের কুসংস্কারের ভিত ভেঙে পড়ে।

তিনি আরও শিখিয়েছেন, কোনো কিছুতে অশুভ লক্ষণ নেই, বরং শুভ প্রত্যাশাই প্রিয়-অর্থাৎ মানুষের উচিত হতাশা ও ভয়ের বদলে আল্লাহর প্রতি সদাশয় প্রত্যাশা পোষণ করা। অন্য এক বর্ণনায় তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি কুলক্ষণে বিশ্বাস করে নিজের প্রয়োজনীয় কাজ থেকে বিরত থাকে, সে যেন শিরকের নিকটবর্তী হলো (মুসনাদে আহমাদ)। এই কঠোর সতর্কবাণী থেকেই বোঝা যায়, ইসলাম কুসংস্কারকে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছে।

সমাজে প্রচলিত প্রথা ও তার অসারতা : দুঃখজনক বিষয় হলো, আজও অনেক মুসলিম সমাজে সফর মাস নিয়ে নানা রকম অবাস্তব প্রতিকারের প্রচলন দেখা যায়। কেউ এই মাসের শেষ বুধবারকে ‘আখেরি চাহারশোম্বা’ নামে বিশেষ ইবাদত বা উৎসবের দিন মনে করে। কেউ বিশেষ নামাজ বা দান-সদকার মাধ্যমে ‘সফরের অনিষ্ট’ থেকে বাঁচার চেষ্টা করে। আবার কেউ এই মাসে বিয়েশাদি বা নতুন কাজ শুরু করা থেকে বিরত থাকে।

অথচ এসবের কোনোটিরই ভিত্তি রসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনী বা তাঁর সাহাবিদের আমলে পাওয়া যায় না। বরং ইতিহাস সাক্ষী, রসুলুল্লাহ নিজে সফর মাসেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে বের হয়েছেন এবং এই মাসে বিবাহ ও অন্যান্য কাজ সম্পাদনে কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেননি।

মানুষের ভয় যখন জ্ঞানের সীমা অতিক্রম করে যায়, তখনই কুসংস্কারের জন্ম হয়। সফর মাস নিয়ে প্রচলিত ভীতি আসলে এমনই এক অজ্ঞতার ফসল, যাকে ইসলাম ১৪০০ বছর আগেই মূলোৎপাটন করেছে। প্রকৃত মুমিনের হৃদয়ে কোনো মাস, কোনো সংখ্যা বা কোনো লক্ষণ ভয় বা অশুভ হওয়ার কারণ হতে পারে না। তাই আমরা কল্পনার কুয়াশা সরিয়ে ইমানের আলোয় প্রতিটি দিন, প্রতিটি মাসকে স্বাগত জানাই।

লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, বসুন্ধরা, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights