কেন চীনের ভাঙা অর্থনীতি মেরামত করতে পারছে না বেইজিং?
অনলাইন ডেস্ক
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি চীনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয়ের দুর্বলতা। দেশটির নাগরিকেরা পর্যাপ্ত অর্থ ব্যয় না করায় উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় ব্যবধান। এর প্রভাব পড়ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ঋণের বোঝা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে। চীনের অতিরিক্ত উৎপাদিত পণ্য কম দামে বিদেশের বাজারে প্রবেশ করায় ইউরোপ থেকে এশিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানও প্রতিযোগিতার চাপে পড়ছে।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাটের ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে চীনের ভোগব্যয়ের হার বর্তমানে সবচেয়ে কম। এমনকি গত এক শতাব্দীতে বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে দেশটির বর্তমান ভোগব্যয়ের হার নজিরবিহীনভাবে নিচে নেমেছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র প্রায় ৫৬ শতাংশ আসে ভোগব্যয় থেকে। অথচ অধিকাংশ অর্থনীতিতে এই হার ৭০ শতাংশ বা তারও বেশি। তুলনা হিসেবে বলা হয়েছে, ১৯৯০-এর দশকে অর্থনৈতিক স্থবিরতার সবচেয়ে খারাপ সময়ে জাপানের জিডিপিতে ভোগব্যয়ের অংশ চীনের বর্তমান হারের চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি ছিল।
প্রবৃদ্ধির গতি কমছে, বাড়ছে ঋণের চাপ
চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে দেশটির প্রবৃদ্ধির হার ১০ শতাংশ বা তার বেশি থাকলেও বর্তমানে তা ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বিশ্লেষণটিতে ভোগব্যয়ের দুর্বলতাকে এই ধীরগতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ভোগব্যয় কম থাকলে বাজারে পণ্য ও সেবার চাহিদা প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ে না। এতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিক্রি ও মুনাফা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রেখেও প্রতিষ্ঠানগুলো যদি পর্যাপ্ত ক্রেতা না পায়, তাহলে তাদের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি কমে গেলে ঋণের বোঝা সামলানোও কঠিন হয়ে পড়ে।
চীনের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও জটিল, কারণ দেশটির অর্থনৈতিক কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক উৎপাদন ও শিল্প সম্প্রসারণের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন কমালে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আবার উৎপাদন অব্যাহত রাখলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে সব পণ্য বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
অতিরিক্ত পণ্য কম দামে বিদেশে
অভ্যন্তরীণ চাহিদার ঘাটতি সামাল দিতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই বিদেশের বাজারের ওপর বেশি নির্ভর করছে। উৎপাদিত পণ্যের বাড়তি অংশ বিদেশে পাঠানো হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে কম দামেও। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চীনা পণ্যের সরবরাহ বাড়ছে এবং স্থানীয় উৎপাদকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে।
দ্য ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণে এ ধরনের পরিস্থিতিকে ‘ডাম্পিং’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সাধারণভাবে, কোনও দেশের বাজারে পণ্য অস্বাভাবিকভাবে কম দামে বিক্রির মাধ্যমে প্রতিযোগীদের ওপর চাপ তৈরির ঘটনাকে ডাম্পিং বলা হয়। তবে কম দামে রফতানি হওয়া প্রতিটি পণ্যই আইনগত অর্থে ডাম্পিং নয়; এ ক্ষেত্রে পণ্যের দাম, উৎপাদন ব্যয় ও বাণিজ্যবিধির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হয়।
ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে চীনের অতিরিক্ত উৎপাদন এবং কম দামে পণ্য রফতানি নিয়ে উদ্বেগ জানাচ্ছে। চীনা পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর শিল্পপ্রতিষ্ঠান মুনাফা ও বাজারের অংশীদারত্ব ধরে রাখার চাপে পড়তে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে স্থানীয় উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও শিল্প বিনিয়োগে।
সমস্যার সমাধান কেন কঠিন
চীনের অর্থনৈতিক সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে উৎপাদন ও ভোগব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা। একদিকে বিপুল উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরে সেই উৎপাদনের সমপরিমাণ চাহিদা তৈরি হচ্ছে না। ফলে রফতানি বাড়ানো ছাড়া উৎপাদকদের সামনে বিকল্প সীমিত হয়ে পড়ছে।
তবে ভোগব্যয় বাড়ানো কেবল পণ্যের সরবরাহ বাড়ানোর মতো সহজ বিষয় নয়। মানুষের ব্যয় করার সক্ষমতা ও আগ্রহ বাড়াতে হলে আয়, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে আস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে উৎপাদননির্ভর প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তিতে পরিণত করাও প্রয়োজন।
দ্য ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণে চীনের অর্থনৈতিক মডেলের এই মৌলিক ভারসাম্যহীনতাকেই প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশটির উৎপাদন সক্ষমতা শক্তিশালী হলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে পর্যাপ্ত চাহিদা তৈরি না হলে সেই সক্ষমতা টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারবে না।
চীনের এই সংকট তাই শুধু দেশটির অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির ভোগব্যয় দুর্বল থাকলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পণ্যের প্রবাহ, শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন দেশের উৎপাদকদের ওপরও তার প্রভাব পড়ে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে না পারলে চীনের অর্থনৈতিক ধীরগতি বিশ্ববাজারেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট
