কোরবানি ঘিরে চাঙা গ্রামীণ অর্থনীতি

ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী হালুয়াঘাট উপজেলার করুয়াপাড়া গ্রামের গরু ব্যবসায়ী আক্কাস আলী এবার ৪৩টি গরু সংগ্রহ করেছেন কোরবানির হাটে বিক্রির জন্য। একই উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে গৃহস্থের বাড়ি থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকায় গরুগুলো সংগ্রহ করেছেন তিনি। ভালো দাম পেলে এখান থেকে প্রায় ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তিনি। এটি তাঁর মৌসুমি ব্যবসা। কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে এ ধরনের মৌসুমি ব্যবসায় এখন গ্রামীণ জনপদের অর্থনীতি চাঙা হতে শুরু করেছে।

বাংলাদেশে কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতির আকার বর্তমানে প্রায় ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার বা ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি বলে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে। এর সঙ্গে পশুর হাট, চামড়াশিল্প, মসলা বাণিজ্য, যাতায়াতসহ বিভিন্ন হিসাবে কোরবানির ঈদের অর্থনীতির আকার এখন প্রায় ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখে কোরবানির পশু। লাখ লাখ গরু, ছাগল ও ভেড়া কেনাবেচায় হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। কাঁচা চামড়া সংগ্রহের মাধ্যমে সারা বছর জুতা ও চামড়াজাত পণ্যের কাঁচামালের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ জোগান আসে এই ঈদ থেকে। গরুর মাংস রান্নাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর ঈদ মৌসুমে কয়েক শ কোটি টাকার অতিরিক্ত মসলা (যেমন জিরা, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ) আমদানি ও বিক্রি হয়। পশু পরিবহন, গরুর খাবার, হাসিল এবং মৌসুমি কসাইদের পারিশ্রমিক বাবদ অর্থনীতিতে যুক্ত হয় বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক চিফ ইকোনমিস্ট ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক এম কে মুজেরি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কোরবানির ঈদের সময় শহর থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ গ্রামে প্রবাহিত হয়, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করে। শহরের মানুষের কেনা পশুর দাম সরাসরি গ্রামের খামারি ও কৃষকদের পকেটে চলে যায়। যাঁরা গৃহস্থ কৃষক, সারা বছর কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে একটি কিংবা দুটি গরু লালনপালন করেন। যাঁরা ছোট খামারি তাঁরা ৫ থেকে ১০টি গরু খামারে লালন করেন কোরবানির ঈদে বিক্রির উদ্দেশ্যে। পাইকাররা এসব গরু গৃহস্থ ও ছোট খামারিদের কাছ থেকে কিনে রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরগুলোতে নিয়ে বিক্রি করেন। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বাড়তি প্রণোদনা সৃষ্টি হয়।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বছর কোরবানির জন্য দেশে পশুর সম্ভাব্য চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। এর বিপরীতে দেশে প্রাপ্যতা রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি পশু। সে হিসাবে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। এ বছর কোরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু ও মহিষ রয়েছে। ছাগল ও ভেড়া আছে ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং ৫ হাজার ৬৫৫টি অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী রয়েছে। কোরবানির যোগ্য এই গবাদিপশু বিক্রির বেশির ভাগ অর্থই যাবে গ্রামীণ জনপদে।

শহর থেকে টাকা যাচ্ছে গ্রামে : রাজধানী ঢাকায় বসবাসরত অধিবাসীর বেশির ভাগই কোরবানি দেওয়ার জন্য গ্রামে চলে যান। ব্যবসাবাণিজ্য ও চাকরির টাকায় তাঁরা নিজ এলাকায় গিয়ে কোরবানির পশু কেনা ছাড়াও নানাভাবে ব্যয় করেন। ঈদের আগে শহরবাসী তাদের আত্মীয়স্বজনদের জন্য টাকা পাঠান এবং বোনাসের একটি বড় অংশ গ্রামে ঈদ করার জন্য নিয়ে যান। চামড়া ব্যবসায়ী, কসাই এবং পরিবহন খাতের সঙ্গে জড়িত অনেকেই এই সময়ে বাড়তি আয় করেন, যা গ্রামের অর্থনীতিতে যুক্ত হয়। পশুর হাটের ব্যবস্থাপনা, হাসিল আদায়, কসাই ও মাংস প্রস্তুতকারক এবং মৌসুমি ব্যাপারি মিলিয়ে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়। এই বিশাল আর্থিক লেনদেন গ্রামের মানুষদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে বড় ভূমিকা পালন করে থাকে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights