ক্যান্সার চিকিৎসায় অভাবনীয় সাফল্য: এক ইনজেকশনেই সম্পূর্ণ টিউমার নির্মূলের ইঙ্গিত

অনলাইন ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে একটি নতুন ধরনের ‘স্মার্ট ইনজেকশন’ ক্যান্সার চিকিৎসায় অভূতপূর্ব ফলাফল দেখিয়েছে বলে দাবি করেছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা। ট্রায়ালের ফলাফল অনুযায়ী, এই ইনজেকশন কিছু রোগীর শরীরে থাকা টিউমার সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করে দিতে সক্ষম হয়েছে।

‘অ্যামিভ্যানটাম্যাব’ (amivantamab) নামের এই ওষুধটি একটি ট্রিপল-অ্যাকশন ক্যান্সার থেরাপি হিসেবে কাজ করে। ১১টি দেশের অংশগ্রহণে পরিচালিত এই ট্রায়ালে এমন রোগীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যাদের ক্যান্সার ইতোমধ্যে শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল অথবা আগের চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছিল না।

গবেষণায় দেখা যায়, ওষুধটি মাথা ও ঘাড়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কার্যকারিতা দেখিয়েছে। ১০২ জন রোগীর মধ্যে ৪৩ জনের টিউমার আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে সঙ্কুচিত হয়। এর মধ্যে ২৮ জনের ক্ষেত্রে টিউমার উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট হয় এবং ১৫ জন রোগীর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্চের অধ্যাপক ও বায়োলজিক্যাল ক্যান্সার থেরাপির বিশেষজ্ঞ কেভিন হ্যারিংটন বলেন, এই ফলাফল ‘অভূতপূর্বভাবে শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া’ নির্দেশ করে।

তিনি বলেন, “যেসব রোগীর ক্যান্সার কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি উভয়ের প্রতিই প্রতিরোধী হয়ে গেছে, তাদের ক্ষেত্রে এমন সাড়া পাওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই চিকিৎসা প্রতিবছর হাজার হাজার রোগীর উপকারে আসতে পারে।”

এই গবেষণার ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে অনুষ্ঠিত বিশ্বের বৃহত্তম ক্যান্সার সম্মেলন আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজিতে উপস্থাপন করা হবে।

গবেষকদের মতে, একই ধরনের ইতিবাচক ফলাফল ফুসফুসের ক্যান্সার রোগীদের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। জে অ্যান্ড জে (জনসন অ্যান্ড জনসন) কর্তৃক উদ্ভাবিত এই ওষুধটি বর্তমানে প্রায় ৬০টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে পরীক্ষা করা হচ্ছে, যেখানে ফুসফুস, কোলন, মস্তিষ্ক ও পাকস্থলীর ক্যান্সার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এই ইনজেকশনটি ক্যান্সারকে তিনটি ভিন্ন উপায়ে লক্ষ্য করে- ‘ইজিএফআর’ নামক প্রোটিনকে বাধা দেয়, এমইটি নামক সেই পথকে বন্ধ করে যা ক্যান্সার কোষকে চিকিৎসা থেকে বাঁচতে সাহায্য করে, এবং রোগীর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে সক্রিয় করে টিউমারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তা করে।

ট্রায়ালে অংশ নেওয়া একজন রোগী কার্ল ওয়ালশ (৫৬) জানান, আগের কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি এই ট্রায়ালে যুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে তার অবস্থার উন্নতি ঘটে। তিনি বলেন, “চিকিৎসা শুরুর কয়েকটি সাইকেলের পরই আমি স্বাভাবিক খাবারে ফিরতে পারি এবং ব্যথা অনেক কমে যায়।”

গবেষণায় আরও বলা হয়, এই ইনজেকশন সাধারণত ত্বকের নিচে ছোট আকারে দেওয়া হয়, যা প্রচলিত ইনট্রাভেনাস ড্রিপের তুলনায় দ্রুত এবং সহজ।

ট্রায়ালে দেখা গেছে, অধিকাংশ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার, এবং খুব কম রোগীকেই চিকিৎসা বন্ধ করতে হয়েছে।

গবেষকদের মতে, বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-এই ট্রায়ালে মানব প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি)- নেতিবাচক মাথা ও ঘাড়ের ক্যান্সার রোগীদের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাদের চিকিৎসা সাধারণত আরও কঠিন।

চিকিৎসা শুরু করার পর রোগীদের গড় বেঁচে থাকার সময় ছিল প্রায় ১২ দশমিক ৫ মাস, যদিও তাদের রোগ ছিল অত্যন্ত অগ্রসর পর্যায়ে।

ইনস্টিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্চের প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক ক্রিস্টিয়ান হেলিন বলেন, এই অগ্রগতি প্রতীয়মান হয় যে, কঠোর বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে সীমিত বিকল্প থাকা রোগীদের ক্ষেত্রেও কার্যকর নতুন চিকিৎসা আনা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ফলাফল ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে, যদিও এটি এখনও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পর্যায়ে রয়েছে এবং আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights