‘ক্যাপিটেশন’ পদ্ধতি নিয়ে কিছু কথা

ড. তৌফিক জোয়ার্দার
সিঙ্গাপুরের মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে, ওদিকে জন্মহার কমছে। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, দেশে বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু তাদের সেবা শুশ্রুষার মানুষ কমছে। এদিকে বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষদের অসংক্রামক ও দীর্ঘমেয়াদি অসুখ বেশি হয়। ফলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপও বাড়ছে। বাড়ছে সরকারের স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়।

এমন পরিস্থিতিতে সিঙ্গাপুর সরকার এক সৃজনশীল পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তারা স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে এমনভাবে ঢেলে সাজিয়েছে যেখানে রোগ প্রতিকারের চেয়ে রোগ প্রতিরোধ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এই বিশাল কর্মপরিকল্পনার নাম Healthier SG। এর অধীনে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

যেমন, চল্লিশোর্ধ্ব সব সিঙ্গাপুরিয়ানকে বিভিন্ন রোগের জন্য আগে থেকেই স্ক্রিনিং করা হচ্ছে যাতে রোগ হওয়ার বা তা গুরুতর আকার ধারণ করার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া যায়। সবাইকে নির্দিষ্ট ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানের সাথে যুক্ত করা হচ্ছে। হাসপাতালগুলোর প্রণোদনা কাঠামো এমনভাবে ঢেলে সাজানো হয়েছে যে তারা নিজ নিজ ক্যাচমেন্ট এলাকায় নিজের স্বার্থেই রোগপ্রতিরোধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

যেমন, ধরা যাক, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে হয়তো দেখা গিয়েছে ‘ক’ সরকারী হাসপাতালে বছরে ১ কোটি টাকা সরকারি বরাদ্দ লাগে। আগে খরচের সাপেক্ষে তারা বিল করলে তাদের জন্য সেই অর্থ ছাড় করা হতো। একে বলে ফি ফর সার্ভিস পদ্ধতি। এখন তাদেরকে বলা হচ্ছে, তোমাকে ১ কোটি টাকাই দেওয়া হবে। কিন্তু তুমি যদি খরচ কমাতে পারো, অর্থাৎ, তোমার যদি ১ কোটি টাকার কম খরচ হয়, বাকি টাকা তুমি রেখে দিতে পারবে। অথচ খরচ বেশি হলে সেটা কিন্তু সরকার থেকে দেওয়া হবেনা।

এ পদ্ধতিকে বলে ক্যাপিটেশন পদ্ধতি। এর ফলে যা হয়েছে তা হলো, হাসপাতালগুলো নিজ নিজ এলাকায় ব্যাপক রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। কারণ, রোগ প্রতিরোধ করতে পারলে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য রোগী কম আসবে। আর হাসপাতালে রোগী যত কম আসবে, তাদের তত ব্যয় সংকোচন হবে। তারা সেই ১ কোটি টাকা থেকে কিছু টাকা সাশ্রয় করতে পারবে। সেটা তারা ব্যাংকে রেখে বা বিনিয়োগ করে নিজেদের মুনাফা বাড়াতে পারবে। চাইলে সেই টাকা থেকে স্টাফদের বেতন ভাতা বাড়াতে পারবে বা নানা সুযোগ সুবিধাও দিতে পারবে।

এগুলো হলো Healthier SG’র ইতিবাচক দিক। কিন্তু এর কিছু নেতিবাচক দিকও থাকতে পারে যা আমরা হয়তো এখনই বুঝতে পারছি না। যেমন ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানরা এই ব্যবস্থা নিয়ে কিছু আশঙ্কা করছে। মানুষকে রোগ প্রতিরোধমূলক পরামর্শ দিতে আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় লেগে যাচ্ছে, অথচ হাসপাতালে চিকিৎসকের সংখ্যা আগের মতোই আছে; বাড়েনি। প্রচুর পেপারওয়ার্ক করতে হচ্ছে। তা ছাড়া ওষুধ দিয়ে রোগ সারানো যতটা সহজ, মানুষের স্বাস্থ্য আচরণ পরিবর্তন করা ততটা সহজ নয়। অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদেরও ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। তাদেরকে প্রচুর পরিমাণে কমিউনিটিভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে, যা হাসপাতালের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের কাজ থেকে অনেক কঠিন।

আমরা একটা গবেষণা করছি Healthier SG বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সিঙ্গাপুর সরকার কি কি সমস্যায় পড়তে পারে তার ওপর। এটা আমার প্রথম prospective policy analysis—অনেক দিন ধরেই এমনই একটা গবেষণা করার ইচ্ছা ছিল। প্রথমে আমার এক ইন্টার্নকে দিয়ে ক্যাপিটেশন পদ্ধতির ওপর স্কোপিং রিভিউ করিয়েছি। এরপর আরেক ইন্টার্নকে দিয়ে করিয়েছি ডকুমেন্ট রিভিউ ও নিউজপেপার রিভিউ। এসবের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করেছি ক্যাপিটেশন মডেল নিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা কি এবং Healthier SG নিয়ে সিঙ্গাপুরে ইতোমধ্যে কী কী আলাপ আলোচনা চলেছে। এরপর আমার রিসার্চ অ্যাসোসিয়েটকে দিয়ে ১৪টা key informant interview করিয়েছি। সেই সাথে ৪৫০ জন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর ওপর জরিপ। এসবের মাধ্যমে Healthier SG বিষয়ে তাদের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করেছি। এসব থেকে পলিসি গ্যাপগুলো বের হয়ে এসেছে।

সর্বশেষ করলাম অংশীজন কর্মশালা বা স্টেকহোল্ডার ওয়ার্কশপ। এখানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের প্রতিনিধি এবং কমিউনিটি পার্টনারদের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেছিল। তাদের মাধ্যমে পলিসি গ্যাপগুলো র‍্যাংকিং করে সবচেয়ে গুরুতর সমস্যাগুলোর সমাধান বের করার চেষ্টা করেছি। ভবিষ্যতে গবেষণাটি পাবলিশ হলে এ নিয়ে আরও বিস্তারিত লিখব। এমন প্রোসপেক্টিভ পলিসি অ্যানালাইসিস বাংলাদেশের জন্যও খুবই সময়োপযোগী, বিশেষ করে সরকার যখন নানা সংস্কার নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে।

লেখক: ড. তৌফিক জোয়ার্দার, সহযোগী অধ্যাপক, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সিঙ্গাপুর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights