খোলা খাবারে রোগের ভয়
জয়শ্রী ভাদুড়ী
দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ রয়েছে। খাদ্য উৎপাদন, প্রস্তুত, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিক্রির ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মানার বাধ্যবাধকতা রয়েছে
রাজধানীর গুলশান-২ মোড়ের ফুটপাতে চলছে আলুর শিঙাড়া ভাজা। এর আগে ভাত, ডাল, লালশাক, আলু-করলা ভাজা, মাছের ঝোল রান্না করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ফুটপাতে পেতে রাখা টেবিল-চেয়ারে বসে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ দুপুরের খাবার খাচ্ছেন। খুলে রাখা খাবারে বসছে মাছি। পাশের সড়কে চলছে মেট্রোরেলের কাজ। সেখান থেকে বাতাসের সঙ্গে উড়ে আসছে ধুলা। একজনের খাওয়া শেষে গামলায় রাখা নোংরা পানিতে প্লেট ধুয়ে আরেকজনকে খেতে দিচ্ছে।
রাজধানী থেকে জেলা শহর, উপজেলা সদর ও মহাসড়কের পাশে অসংখ্য ছোটবড় খাবার হোটেলে প্রতিদিন এমন পরিবেশেই তৈরি ও বিক্রি হচ্ছে খাবার। কম দামে দ্রুত খাবার পাওয়ায় শ্রমজীবী মানুষ, যাত্রী, শিক্ষার্থী ও নিম্নআয়ের মানুষের বড় একটি অংশ এসব হোটেলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু খাবার ঢেকে না রাখা, অপরিচ্ছন্ন রান্নাঘর, অনিরাপদ পানি এবং খাদ্য সংরক্ষণে অনিয়মের কারণে বাড়ছে খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দূষিত খাবারে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, পরজীবী ও অন্যান্য জীবাণু থাকতে পারে। এসব জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, খাদ্যে বিষক্রিয়া এবং হেপাটাইটিস-এ ও ই-এর মতো রোগ হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, অনিরাপদ খাবার থেকে বিশ্বজুড়ে ২০০টির বেশি রোগ হতে পারে এবং প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ দূষিত খাবার খেয়ে অসুস্থ হন।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর তেজগাঁওয়ে রাস্তার পাশের হোটেলে রান্না করা খাবার বড় পাত্রে সাজিয়ে রাখা হলেও সেগুলোর ওপর কোনো ঢাকনা নেই। সকাল থেকে দুপুর, কখনো বিকাল পর্যন্ত একই খাবার খোলা অবস্থায় রাখা হয়। খাবারের ওপর মাছি বসছে, যানবাহনের ধুলা পড়ছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে হোটেলের কর্মীরা খালি হাতে খাবার পরিবেশন করছেন। এ ব্যাপারে হিউম্যান এইড বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি ডা. শেখ মইনুল খোকন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘অস্বাস্থ্যকরভাবে রান্না ও পরিবেশন করা খাবার খেলে মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে পারে। খাবারে মাছি, ধুলাবালি বিপদ ডেকে আনে। দূষিত পানি ব্যবহারে টাইফয়েড, জন্ডিস, হেপাটাইটিসের ঝুঁকি বাড়ে। লিভারের সমস্যার পাশাপাশি কিডনির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় এসব খাবার। অনেক উপাদান দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত তৈরি করে এবং দুরারোগ্য রোগ জন্ম দেয়। এতে ঝুঁকিতে পড়ে জনস্বাস্থ্য।’ খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, মাছি আবর্জনা, নোংরা ড্রেন ও মলমূত্রের সংস্পর্শে গিয়ে পরে খাবারের ওপর বসলে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। আবার রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় অনুপযুক্ত তাপমাত্রায় রেখে দিলে কিছু জীবাণু দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় খাবার নিরাপদ রাখতে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা, সঠিক তাপমাত্রায় খাবার রান্না এবং নিরাপদ তাপমাত্রায় সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় রান্না করা খাবার নিরাপদভাবে সংরক্ষণ এবং পরিবেশনের আগে প্রয়োজন হলে ভালোভাবে গরম করার কথাও বলা হয়েছে।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি) ড. মোহাম্মদ মোস্তফা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘অস্বাস্থ্যকর, খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। তবে রমজান মাসের মতো টিম তৈরি করে করা হয় না। খাবারে ফুড কালারের বাইরে যেন কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক রং ব্যবহার না হয় সে বিষয়ে নজর রাখা হয়। হোটেল, রেস্টুরেন্টে পোড়া তেলের ব্যবহার প্রতিরোধে টেস্ট মিটার ব্যবহার করা হয়। খবরের কাগজে খাবার পরিবেশনকে নিরুৎসাহিত করতে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে খাদ্য তৈরিতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম নেওয়া হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাজার থেকে বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রীর নমুনা সংগ্রহ করে প্রতি মাসে পরীক্ষা করা হয়। নিজস্ব ল্যাব না থাকায় রাজধানীর সরকারি বিভিন্ন পরীক্ষাগারে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় অর্থ পরিশোধ করে পরীক্ষাগুলো করে থাকে। এ ছাড়া দেশের সব জেলা থেকে প্রতি মাসে দুটি নমুনা পাঠানোর নির্দেশনা রয়েছে। জেলাগুলোতে মাত্র তিনজন কর্মী দিয়ে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। জনবল সংকটের কারণে মনিটরিংয়ে কিছুটা সমস্যা হয়।’
দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ রয়েছে। খাদ্য উৎপাদন, প্রস্তুত, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিক্রির ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মানার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও জেলা প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করে। তবে অভিযোগ রয়েছে, অভিযান অনেক সময় নির্দিষ্ট এলাকা বা বিশেষ উপলক্ষকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে।
