গতি আনতে হবে অর্থনীতিতে
প্রিন্সিপাল এম এইচ খান মঞ্জু
দেশের অর্থনীতিকে ভয়াবহ অবস্থায় রেখে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার। পাশাপাশি বিপুল বকেয়া রেখে গেছে। অর্থনীতির এই দৈন্য নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। এখন জনগণের প্রাত্যহিক চাহিদা মেটানোই দায় হয়ে পড়েছে। অর্থাভাবে জনপ্রত্যাশা কীভাবে পূরণ করা হবে, তা নিয়ে সরকারের দায়িত্বশীল অনেকেই চিন্তিত।
অন্তর্র্বর্তী সরকার চলতি অর্থবছরে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছিল। এর মধ্যে পরিচালন খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৩১৭ কোটি এবং উন্নয়ন খাতে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাসে সরকার ব্যয় করেছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা, যার মধ্যে পরিচালন খাতে ২ লাখ ২০ হাজার ৪৬৩ কোটি এবং উন্নয়ন খাতে ৩১ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। একই সময়ে রাজস্ব আহরণ হয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা। ফলে বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা, যার মধ্যে বেশির ভাগই ঋণ নিয়ে মেটানো হয়েছে। এ পরিসংখ্যান থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, অন্তর্র্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে কোথায় রেখে গেছে। কীভাবে ঋণের বোঝা নতুন সরকারের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সীমিত সামর্থ্য, বাড়তে থাকা ঋণের বোঝা এবং জনমুখী প্রতিশ্রুতির চাপ-এই তিন সমস্যা মোকাবিলা করাই নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে সরকারের রাজনৈতিক যেসব প্রতিশ্রুতি রয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে অর্থসংস্থান করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে পরিস্থিতিকে নিজের জন্য ‘অগ্নিপরীক্ষা’ হিসেবে উল্লেখ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী বলেছেন, বিগত সময়ে যে পরিমাণ বকেয়া রেখে যাওয়া হয়েছে, তা পরিশোধ করে সমন্বয় করা অত্যন্ত কঠিন। বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া রয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি কমানোই সবচেয়ে জরুরি। কারণ এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর। বাজারব্যবস্থাপনা শক্ত করা, সরবরাহ বৃদ্ধি, নীতি সমন্বয় এসব দ্রুত করতে হবে। লাগাম টেনে ধরতে না পারলে মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হবে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হলে আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতি ধারাবাহিকতা, সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিনিয়োগকারী যদি ঝুঁকি দেখেন, তারা আসবেন না। নতুন সরকার এ ক্ষেত্রে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলে দেশীয় ও বিদেশি উভয় বিনিয়োগই বাড়বে।
আমাদের অর্থনীতি এখন ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের। ২০৩৫ সালে এ অর্থনীতি ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে বলে প্রত্যাশা করি। এমন একটি অর্থনীতি যদি প্রত্যাশা করি, তার পেছনে কিছু পরিবর্তন দরকার। মনে রাখতে হবে, ২০২৪ সালে আমাদের আন্দোলনের মূল কারণ ছিল কর্মসংস্থান। আমাদের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ছিল জবলেস প্রবৃদ্ধি। সুতরাং কর্মসংস্থান সৃষ্টি স্ট্র্যাটেজির প্রধান উপজীব্য হতে হবে। সরকারকেও অনেক প্রকল্প নিতে হবে, যেখানে মানুষের কর্মসংস্থান হবে। সরকারি ও বেসরকারি খাতকে যৌথভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে দেশিবিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে।
বন্ধ কারখানা চালু করতে এবং বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক পাশে থাকবে বলে জানিয়েছেন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। গত ২৯ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের কনফারেন্স কক্ষে ইআরএফ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, ‘কিছু কারখানা আগেই বন্ধ হয়েছিল। ৫ আগস্টের পর আরও কিছু বন্ধ হয়ে গেছে। সেই কারখানাগুলোকে কীভাবে আবার উৎপাদনে নিয়ে আসা যায়, সেটা আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি। ব্যাংকগুলোকে আমরা সহায়তা করার কথা বলছি, যাতে তারা উৎপাদনে ফিরে এসে ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করে প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যথায় কারখানার সম্পদ দিনদিন নষ্ট হয়ে যাবে এবং ব্যাংক টাকা ফেরত পাবে না।’
উন্নয়নের একটি প্রধান শর্ত হচ্ছে কর্মসংস্থান। আর এ কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজন দেশে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি। বাংলাদেশকে অপার সম্ভাবনার দেশ হিসেবেই দেখছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে তরুণ জনগোষ্ঠীকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে। বাংলাদেশের সামনেও সোনালি ভবিষ্যৎ হাতছানি দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সফল হবে কি না, তা নির্ভর করছে সৃষ্ট সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাবে তার ওপর। দেশের সোনালি ভবিষ্যতের স্বার্থেই কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে গতি আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
♦ লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য
