গাঁজা ও ঘুমের ওষুধ খেয়ে ককপিটে, এয়ার ইন্ডিয়া পাইলটের যত কাণ্ড!
গত সপ্তাহে থাইল্যান্ডের ফুকেট থেকে দিল্লিগামী এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বিমান মাঝ-আকাশে হঠাৎ প্রায় ৩০০ ফুট নিচে নেমে ২৪ জন আরোহী আহত হওয়ার ঘটনাটি নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। ফ্লাইটটির প্রধান পাইলট বা পাইলট-ইন-কমান্ড ডোপ টেস্টে দুবার গাঁজা সেবনের জন্য পজিটিভ প্রমাণিত হওয়ার পর এবার জানা গেছে, তিনি অনিদ্রাজনিত সমস্যার কারণে চিকিৎসকের দেওয়া ঘুমের ওষুধও সেবন করছিলেন।
এয়ার ইন্ডিয়ার অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট সেফটি রিপোর্টের বরাতে প্রকাশ পাওয়া এই বিস্ফোরক তথ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত নানা সমস্যার কারণে বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি সঠিকভাবে ঘুমাতে পারছিলেন না। গত ৪ আগস্ট ১৩৭ জন যাত্রী ও ৮ জন ক্রু সদস্য নিয়ে ফুকেট থেকে দিল্লির উদ্দেশে রওনা হয়েছিল এয়ার ইন্ডিয়ার ‘এআই-২৩৭৯’ ফ্লাইটটি। কিন্তু উড়োজাহাজটি মাঝ-আকাশে থাকা অবস্থায় আচমকা ৩০০ ফুট নিচে নেমে যায়। এতে অন্তত ২০ জন যাত্রী এবং ৪ জন ক্রু সদস্য মারাত্মকভাবে আহত হন। পরবর্তীতে বিমানটি দিল্লিতে নিরাপদে অবতরণ করলেও পাইলটের ফিটনেস এবং সার্বিক আচরণ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন ওঠে।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রিপোর্টে পাইলট নিজের ব্যাখ্যা দিয়ে জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঘুমানোর সমস্যায় ভুগছিলেন এবং এর জন্য তার পারিবারিক চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তিনি ওষুধও গ্রহণ করছিলেন। ফুকেটে যাত্রাবিরতির (লে-ওভার) সময় তিনি ঘুমানোর চেষ্টা করলেও ঘুম আসছিল না, যার কারণে ঘুমের মান বাড়ানোর আশায় তিনি কিছুটা হাঁটাহাঁটি করাকে ইতিবাচক মনে করেছিলেন। পাইলট তার প্রতিবেদনে রোস্টার বা কাজের সময়সূচি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তার দাবি, যদিও কাজের সময়সূচি বা রোস্টার আইনগতভাবে নির্ধারিত বিশ্রামের সীমার মধ্যেই ছিল, কিন্তু তবু এটি এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যে দিনের বেলায় পর্যাপ্ত বিশ্রামের সময় অনেক কমে যায়। ফলে শরীর পুরোপুরি পুনরুদ্ধারের জন্য যে পরিমাণ ন্যূনতম বিশ্রামের প্রয়োজন, তা পাওয়া যেত না।
তিনি আরও জানান, ফুকেটের প্রথম ফ্লাইটের জন্য তাকে রাত ১২টা ১০ মিনিটে ডিউটিতে রিপোর্ট করতে হয়েছিল, যার অর্থ ছিল রাত ১০টার অনেক আগেই প্রস্তুতি শুরু করা। ওই সময়ে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম নেওয়া অত্যন্ত কঠিন ছিল। এ ছাড়া বিমান অবতরণ, পরবর্তী দায়িত্ব শেষ করা এবং ফুকেটের হোটেলে পৌঁছাতে প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লেগে যেত, যা দিনের বেলার বিশ্রামের সময়কে আরও কমিয়ে দিত। দ্বিতীয় ফ্লাইটের জন্য তাকে ভারতীয় সময় অনুযায়ী ভোররাত ৩টাতেই জেগে উঠতে হয়েছিল। এই দুর্ঘটনার সময় পাইলটের ভূমিকা ও আচরণ এখন চরম তদন্তের মুখোমুখি।
জানা গেছে, উড়িষ্যার ওপর দিয়ে উড্ডয়নের সময় যখন বিমানটি আচমকা ৩০০ ফুট নিচে নেমে যায়, তখন এই প্রধান পাইলট ককপিটে নিজের সিটে বসে ছিলেন না; বরং ফার্স্ট অফিসার (সহকারী পাইলট) বিমান পরিচালনায় দায়িত্বে ছিলেন। বিমান চরম ঝাঁকুনি খাওয়ার পর প্রধান পাইলট কেবিনে যান এবং আহত যাত্রীদের খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি তাকে বা বিমানটির ভেতরের পরিস্থিতি চিত্রায়ন ও ভিডিও করতে নিষেধ করেন।
ঘটনার পর দিল্লিতে অবতরণের পর পাইলটের শারীরিক ভারসাম্যহীনতা পরিলক্ষিত হয় এবং হেঁটে যাওয়ার সময় তাকে অন্য একজনের সাহায্য নিতে দেখা যায়। এমনকি ইউরিন ডোপ টেস্টের নমুনা জমা দেওয়ার সময়ও একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা তাকে শারীরিকভাবে ধরে সাহায্য করেন।
ঘটনার আগের কিছু নাটকীয় প্রেক্ষাপটও তদন্তে উঠে এসেছে। দিল্লি থেকে ফুকেট যাওয়ার মূল ফ্লাইটে এই পাইলট যখন ওয়াশরুমে যান, তখন নিয়ম অনুযায়ী ককপিটে একজন কেবিন ক্রুকে ডেকে বসানো হয়েছিল। তবে সেই কেবিন ক্রু অপারেশন পরিচালনায় দক্ষ না থাকায় পাইলট তাকে ধমক দেন। পরে বিষয়টির মিটমাট করতে তিনি ফুকেট পৌঁছানোর পর ফিরতি ফ্লাইটের আগে সব ক্রু সদস্যকে নিয়ে একটি পার্টিতে যোগ দেন। পরবর্তীতে দিল্লিতে অবতরণের পর উভয় পাইলটকেই তাৎক্ষণিকভাবে উড্ডয়ন-সংক্রান্ত সব দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি (অফ-রোস্টার) দেওয়া হয়েছে এবং ঘটনাটির সার্বিক তদন্ত প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি
