গাজার বিষাক্ত বর্জ্য পৌঁছাচ্ছে ইসরায়েলেও

অনলাইন ডেস্ক

গাজায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও অবকাঠামো ধ্বংসের ফলে সৃষ্ট বিপুল পরিমাণ বর্জ্য, অপরিশোধিত পয়োনিষ্কাশন এবং দূষিত ধ্বংসস্তূপ এখন শুধু ফিলিস্তিনিদের জন্য নয়, ইসরায়েলের জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্যও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি তৈরি করছে।

পরিবেশগত এই ধ্বংসযজ্ঞকে ‘ইকোসাইড’ বা পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করে একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গাজা ও ইসরায়েলের অভিন্ন সামুদ্রিক পরিবেশ ও ভূগর্ভস্থ পানির উৎসের কারণে এ সংকট শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলেও প্রভাব ফেলছে।

সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং ‘বোর্ড অব পিস’-এর প্রতিনিধিরা ইসরায়েল ও গাজা—উভয় অঞ্চলের পয়োনিষ্কাশন ও জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে সম্মত হয়েছেন। তবে ওই কমিটির সদস্য কারা থাকবেন এবং কীভাবে এটি কাজ করবে, সে বিষয়ে এখনও বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গাজায় বিদ্যুৎ ও পয়োনিষ্কাশন অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ফলে প্রতিদিন এক লাখ ঘনমিটারের বেশি অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য ভূমিতে কিংবা সরাসরি ভূমধ্যসাগরে গিয়ে পড়ছে। গাজা ও ইসরায়েল একই উপকূলীয় প্রতিবেশব্যবস্থা এবং উপকূলীয় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ভাগাভাগি করায় এর প্রভাব সীমান্তের ওপারেও পৌঁছাচ্ছে।

সাগরে প্রবাহিত হচ্ছে অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য
গাজা উপকূল থেকে ভূমধ্যসাগরে প্রবাহিত বর্জ্যের একটি বড় অংশ সাগরের স্রোতের কারণে উত্তর দিকে ইসরায়েলি জলসীমার দিকে চলে যাচ্ছে বলে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে। এ কারণে ইসরায়েলের উপকূলীয় এলাকা ও সামুদ্রিক পরিবেশেও দূষণের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

দক্ষিণ ইসরায়েলের আশকেলন ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট বা লবণমুক্তকরণ প্রকল্পকে গাজার বর্জ্যপানি থেকে ছড়িয়ে পড়া উচ্চমাত্রার মলজাতীয় ব্যাকটেরিয়া দূষণের কারণে একাধিকবার বন্ধ রাখতে হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য সাগরে বিষাক্ত শৈবাল বৃদ্ধির ঘটনাও ঘটাতে পারে। এসব শৈবাল লবণমুক্তকরণ প্রকল্পের পানি পরিশোধন ও ফিল্টারিং ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত বা অকার্যকর করে দিতে পারে। একই সঙ্গে সমুদ্রে এমন কিছু অঞ্চল তৈরি হতে পারে, যেখানে অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে সামুদ্রিক প্রাণীর স্বাভাবিক জীবন ও মাছ ধরার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়।

মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্যেও দূষণের আশঙ্কা
গাজার বর্জ্যপানিতে থাকা বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ, ভারী ধাতু এবং রোগজীবাণু সামুদ্রিক প্রাণীর দেহে জমা হতে পারে। মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী আন্তর্জাতিক জলসীমা বা রাজনৈতিক সীমারেখা মানে না। ফলে দূষিত সামুদ্রিক খাদ্য ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি—উভয় জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

গাজায় ছড়িয়ে থাকা রোগজীবাণু অপরিশোধিত পয়োবর্জ্যের সঙ্গে সামুদ্রিক পরিবেশে প্রবেশ করে উপকূলের উত্তরে ইসরায়েলি শহরগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে।

তবে দূষিত ভূগর্ভস্থ পানি সরাসরি ইসরায়েলের পৌর পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রবেশ করার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তারপরও অভিন্ন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ও আশপাশের পরিবেশের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকতে পারে।

বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো লবণ ও অন্যান্য রাসায়নিক দূষক। এগুলো তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে এবং দীর্ঘ সময় ধরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের মান নষ্ট করতে পারে। এর ফলে সেচ, কৃষিকাজ ও পানীয় জলের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহারযোগ্যতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গাজার ধ্বংসস্তূপ ইসরায়েল ও পশ্চিম তীরে সরানোর অভিযোগ
গাজার পরিবেশগত সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বিপুল ধ্বংসস্তূপ। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, গাজায় আনুমানিক ৬ কোটি টন ধ্বংসস্তূপ জমেছে।

বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, ইসরায়েল সম্প্রতি গাজার কিছু ধ্বংসস্তূপ ইসরায়েল ও অধিকৃত পশ্চিম তীরের অজ্ঞাত স্থানে সরিয়ে নেওয়া শুরু করেছে। ইউরো-মেড মনিটরের পর্যবেক্ষণের বরাত দিয়ে এতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ১০০টি ইসরায়েলি ট্রাক ধ্বংসাবশেষ নিয়ে গাজা থেকে বের হয়েছে।

এই ধ্বংসস্তূপে বিভিন্ন ধরনের বিপজ্জনক উপাদান থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে সিসা, পারদ ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু, বিভিন্ন ধরনের সামরিক অস্ত্রের অবশিষ্টাংশ, সাদা ফসফরাসের কণা, অবিস্ফোরিত বিস্ফোরক, শিল্পকারখানার রাসায়নিক পদার্থ এবং পুরোনো ভবন ধ্বংসের ফলে ছড়িয়ে পড়া অ্যাসবেস্টসের তন্তু থাকতে পারে।

এসব উপাদান মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ভারী ধাতু ক্যান্সার, জিনগত পরিবর্তন, ভ্রূণের বিকাশে ক্ষতি, স্নায়ুতন্ত্র ও কিডনির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব এবং জীবদেহে দীর্ঘদিন জমে থাকার মতো ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে থাকেন।

ধ্বংসস্তূপে লুকিয়ে থাকতে পারে অবিস্ফোরিত বিস্ফোরক
যুদ্ধবিধ্বস্ত ভবনের ধ্বংসস্তূপে শুধু রাসায়নিক ও ভারী ধাতুই নয়, মানবদেহের অবশিষ্টাংশ, জৈব বর্জ্য, রোগজীবাণু এবং পচনশীল পদার্থও থাকতে পারে। এর পাশাপাশি ইঁদুর, পোকামাকড়সহ বিভিন্ন রোগবাহক প্রাণীর উপস্থিতিও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।

ধ্বংসস্তূপ সরানোর সময় বাতাসে ক্ষতিকর ধূলিকণা ও অ্যাসবেস্টস ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বায়ুর মান আরও খারাপ হতে পারে। একই সঙ্গে ধ্বংসস্তূপের নিচে লুকিয়ে থাকা অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ বা বিস্ফোরক যেকোনও সময় বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এসব উপাদান মাটিকেও বিষাক্ত করে তুলতে পারে।

আন্তর্জাতিক পরিবেশগত নীতিমালা অনুযায়ী, এ ধরনের উচ্চমাত্রায় দূষিত দুর্যোগ-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ করা প্রয়োজন। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি)সহ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এ ধরনের বর্জ্য সরানো, সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান আলাদা করা এবং মানবদেহের অবশিষ্টাংশ শনাক্ত হলে কার্যক্রম স্থগিত করার মতো কঠোর প্রোটোকলের কথা বলে থাকে।

সীমান্ত অতিক্রম করে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে এ ধরনের বর্জ্য সরানো হলে মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানির সুরক্ষার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পায়।

গণকবরের প্রমাণ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা
গাজার ধ্বংসস্তূপ অপসারণ নিয়ে আরেকটি গুরুতর উদ্বেগও রয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, যেসব এলাকায় গণকবর থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে বুলডোজার দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানো হলে যুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত কথিত অপরাধের গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

এর পাশাপাশি যথাযথ আন্তর্জাতিক পরিবেশগত নিয়ম না মেনে ধ্বংসস্তূপ সরানো হলে সংগ্রহ, পরিবহন ও নিষ্পত্তির সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক এবং ওই এলাকাগুলোতে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, যদি গাজার দূষিত বর্জ্য এমনভাবে সরানো হয় যার ফলে ইসরায়েলের ভূগর্ভস্থ পানির উৎস সুরক্ষিত থাকে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি দূষণের বোঝা পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর ওপর পড়ে, তাহলেও এর ঝুঁকি পুরোপুরি সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব নয়। কারণ বর্জ্য পরিবহন ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত কর্মী এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দারাও দূষণের সংস্পর্শে আসতে পারেন।

অভিন্ন পরিবেশের সংকট নতুন নয়
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে যে, গাজা ও ইসরায়েল ভৌগোলিকভাবে অভিন্ন পরিবেশগত ব্যবস্থার অংশ। ফলে এক অঞ্চলের পানি, বর্জ্য ও পরিবেশগত সংকট অন্য অঞ্চলেও প্রভাব ফেলতে পারে।

পরিবেশ সংগঠন ‘ইকোপিস’সহ বিভিন্ন সংস্থা বহু বছর ধরে গাজা ও ইসরায়েলের পরিবেশগত আন্তঃনির্ভরতার বিষয়টি তুলে ধরে আসছে। তাদের বক্তব্য হলো, গাজার মানবিক ও পয়োনিষ্কাশন সংকটকে শুধু ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে ইসরায়েলেও পৌঁছাতে পারে।

১৯৯০ সালে জেরুজালেমের তৎকালীন মেয়র টেডি কোলেকও পূর্ব জেরুজালেমের আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে পানি ও পয়োনিষ্কাশন অবকাঠামোর সীমিত উন্নয়নের প্রসঙ্গে কলেরা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার কথা স্বীকার করেছিলেন বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে গাজায় চলমান পরিবেশগত বিপর্যয় শুধু যুদ্ধের তাৎক্ষণিক ধ্বংসের বিষয় নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদে পানি, মাটি, সামুদ্রিক পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তের দুই পাশে পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আন্তর্জাতিক পরিবেশগত নীতিমালা অনুসরণ, দূষিত বর্জ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা এবং পয়োনিষ্কাশন অবকাঠামো পুনর্গঠন জরুরি। সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights