গুলি নয়, ইয়াবাই অস্ত্র : আরাকান আর্মির নীরব আগ্রাসন
এম রায়হানুল ইসলাম
মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে চলমান সংঘাত এখন আর কেবল একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বা জাতিগত সংকট নয়; এটি ধীরে ধীরে বাংলাদেশের জন্য একটি বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ও সামাজিক বিপর্যয়ের উৎসে পরিণত হচ্ছে। এই অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আরাকান আর্মি-একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী, যারা সামরিক শক্তির পাশাপাশি মাদক অর্থনীতির ওপর ভর করে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে। তাদের এই অপরাধভিত্তিক শক্তির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে প্রতিবেশী বাংলাদেশ।
রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট, সীমান্ত উত্তেজনা ও অনুপ্রবেশের চাপের মধ্যেই বাংলাদেশ এতদিন রাখাইন পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছিল। কিন্তু আরাকান আর্মির মাদক কার্যক্রম সেই সংকটকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ ও নতুন ধরনের সিন্থেটিক ড্রাগ এখন শুধু সীমান্তবর্তী এলাকার সমস্যা নয়-এটি জাতীয় নিরাপত্তা, যুবসমাজ, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হয়ে উঠছে।
আরাকান আর্মির উত্থান মূলত মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ার ফল। সামরিক জান্তার সঙ্গে সংঘাতের সুযোগ নিয়ে তারা রাখাইন অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। কিন্তু এই নিয়ন্ত্রণ কেবল রাজনৈতিক বা সামরিক নয়; এর সঙ্গে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী অপরাধ অর্থনীতি। অস্ত্র সংগ্রহ, যোদ্ধাদের রসদ ও প্রশাসনিক কাঠামো টিকিয়ে রাখতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়-যার প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে মাদক ব্যবসা।
রাখাইন ও সংলগ্ন অঞ্চল বহুদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মাদক নেটওয়ার্কের অংশ। আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর এই ব্যবসা আরও সংগঠিত ও নিরাপদ রূপ পেয়েছে। মাদক উৎপাদন ও পাচারকারী সিন্ডিকেটগুলোর কাছ থেকে ‘কর’ আদায়, রুট ব্যবহারের অনুমতি এবং নিরাপত্তা দেওয়ার বিনিময়ে তারা নিয়মিত আয় করছে। এই অর্থ দিয়েই তাদের সামরিক শক্তি বাড়ছে, যা আবার সীমান্ত অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে-একটি বিপজ্জনক চক্র।
বাংলাদেশ এই চক্রের সবচেয়ে দুর্বল কড়ি। নাফ নদী, উপকূলীয় জলসীমা, পাহাড়ি সীমান্ত এবং দীর্ঘ, দুর্গম এলাকা মাদক পাচারের জন্য আদর্শ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় কিছু পাচারকারী চক্র ও দুর্নীতিপরায়ণ উপাদান। ফলে ইয়াবা ও আইস এখন দেশের ভেতরে সহজলভ্য হয়ে উঠেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে যুবসমাজের ওপর।
মাদকাসক্তি আজ শুধু স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়; এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের রূপ নিচ্ছে। কর্মক্ষম যুবশক্তি ধ্বংস হচ্ছে, অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে, পরিবার ও সমাজ ভেঙে পড়ছে। একই সঙ্গে মাদক অর্থনীতি একটি বিশাল কালো টাকার প্রবাহ তৈরি করছে, যা বৈধ অর্থনীতিকে দুর্বল করছে এবং মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
নিরাপত্তার দিক থেকেও ঝুঁকি কম নয়। মাদক থেকে অর্জিত অর্থ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে গেলে ‘ক্রাইম-টেরর নেক্সাস’ তৈরি হয়-যেখানে অপরাধ আর সন্ত্রাস একে অপরকে শক্তিশালী করে। এর ফল সীমান্তে গোলাগুলি, জেলেদের অপহরণ, রোহিঙ্গা শিবিরে অপরাধ বৃদ্ধি এবং পার্বত্য অঞ্চলে নতুন অস্থিরতার আশঙ্কা।
আন্তর্জাতিক পরিসরেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশ যদি মাদক ট্রানজিট রুট হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে, তবে কূটনৈতিক চাপ, নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
এই বাস্তবতায় মাদক সমস্যাকে শুধু আইন-শৃঙ্খলা ইস্যু হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি জাতীয় নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের প্রশ্ন। সীমান্ত নজরদারি জোরদারের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ, আঞ্চলিক কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং অভ্যন্তরীণভাবে মাদক সিন্ডিকেটের আর্থিক নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা জরুরি। একই সঙ্গে যুবসমাজকে রক্ষায় সচেতনতা, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের বিকল্প তৈরি করতে হবে।
আরাকান আর্মির মাদক সাম্রাজ্য আজ নীরবে কিন্তু গভীরভাবে বাংলাদেশের ভেতর শিকড় গাঁড়ছে। এখনই যদি সমন্বিত, কঠোর ও দূরদর্শী পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে এই সংকট আগামী দিনে রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
